কয়রায় বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ভরাটে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ, ঝুঁকিতে কৃষিজমি

Shahrier Islam Pallab
কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:৪৭ অপরাহ্ন, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৭:৪৭ অপরাহ্ন, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ মো ইউনুস আলী
ছবিঃ মো ইউনুস আলী

খুলনার কয়রায় কৃষিজমির ভূগর্ভ থেকে যন্ত্রের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করে তা পল্লী বিদ্যুতের ২ নম্বর উপকেন্দ্রের জায়গা ভরাটে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে একবার বালু উত্তোলন বন্ধ হলেও পুনরায় কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিনে কৃষিজমিতে স্থাপিত যন্ত্র দিয়ে ভূগর্ভ থেকে বালু তুলে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি উপকেন্দ্রের জায়গায় ফেলতে দেখা গেছে। এতে আশপাশের কৃষিজমি দেবে যাওয়া ও স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকারি বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণে বালুর বৈধ উৎস নিশ্চিত করার নির্দেশনা থাকলেও তা প্রতিপালন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার কৃষিজমি থেকে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করছেন শাহরিয়ার কবির টুলু। তাঁর কাছ থেকে বালু কিনে উপকেন্দ্রের জায়গা ভরাটের কাজ করছেন এস কে আশিকুর রহমান রিপন। তিনি টিএস ট্রান্সফরমার্স লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট বালু ভরাটের কাজে যুক্ত বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন: নির্বাচনী ওয়াদা পূরণে কুলাউড়ায় ৫৩৩ চা শ্রমিককে রেইনকোট দিলেন এমপি

সরেজমিনে দেখা যায়, কৃষিজমিতে যন্ত্র বসিয়ে ভূগর্ভ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই বালু সরাসরি উপকেন্দ্রের জায়গায় সরবরাহ করা হচ্ছে। আশপাশের একাধিক জমির মালিকের অভিযোগ, তাঁদের আপত্তি উপেক্ষা করেই বালু উত্তোলন চলছে। এতে কৃষিজমি দেবে যাওয়া, ভূমিধস ও ফসলি জমির স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপকেন্দ্রের জায়গা ভরাটে প্রায় তিন লাখ ঘনফুট বালুর প্রয়োজন। টিএস ট্রান্সফরমার্স লিমিটেডের বালু ভরাটের চুক্তিতে প্রতি ঘনফুটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ টাকা ৫০ পয়সা। বিপুল পরিমাণ এই বালুর উৎস ও সরবরাহের বৈধতা নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আরও পড়ুন: সেন্টমার্টিনে প্রবেশ করতে মানতে হবে যেসব নিয়ম

বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ৫(১) ধারায় পাম্প, ড্রেজিং বা অন্য কোনো মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ বালু বা মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ রয়েছে। আইনটির ১৫ ধারায় বিধান লঙ্ঘনের জন্য কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্তের বিধান রয়েছে।

এদিকে অনুসন্ধানে পাওয়া কথোপকথন ও স্থানীয়দের অভিযোগে বালু উত্তোলন ও বিক্রির নেপথ্যে একটি প্রভাবশালী চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক বাধার পরও ওই চক্রের প্রভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে।

বালু উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহরিয়ার কবির টুলু বলেন, ‘আমার টাকার প্রয়োজন, তাই বালু বিক্রি করছি।’ ভূগর্ভ থেকে বালু উত্তোলনে আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও কীভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সব ম্যানেজ করে তুলছি।’ তবে কাদের বা কীভাবে ‘ম্যানেজ’ করেছেন, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি।

এ বিষয়ে টিএস ট্রান্সফরমার্স লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজার চঞ্চল এর আগে বলেছিলেন, ‘অবশ্যই বৈধ উৎস থেকে বালু সরবরাহ করার কথা। সেভাবেই তাঁর সঙ্গে আমাদের চুক্তি হয়েছে।’

তবে সরেজমিনে কৃষিজমির ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিত বালু সরাসরি উপকেন্দ্রের জায়গায় ব্যবহার করতে দেখা গেছে। ফলে চুক্তি অনুযায়ী বৈধ উৎস থেকে বালু সংগ্রহের শর্ত প্রতিপালন ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে ডেপুটি ম্যানেজার চঞ্চলের সঙ্গে পুনরায় একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বিস্তারিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সেলিম রেজা বলেন, ‘উপকেন্দ্রের জায়গা ভরাটে বৈধ উৎস থেকে বালু সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্টদের লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরপরও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে প্রকল্পে ব্যবহার করা হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কয়রা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শ্রাবণী বিশ্বাস বলেন, ‘বিষয়টি জানতে পেরে বালু উত্তোলন বন্ধ করেছি।’ প্রশাসনের বাধার পরও পুনরায় উত্তোলন এবং প্রভাবশালী চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

এ বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান জানতে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল বাকীর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি। পরে অভিযোগের বিস্তারিত জানিয়ে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় জমির মালিকেরা অবিলম্বে বালু উত্তোলন বন্ধ, ঝুঁকিতে থাকা কৃষিজমি রক্ষা এবং প্রশাসনিক বাধা উপেক্ষা করে উত্তোলন অব্যাহত রাখার অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারি বিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহৃত বালুর বৈধ উৎস যাচাই এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।