নাম পরিবর্তনের কবলে দেশ

Sanchoy Biswas
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশিত: ৫:১১ অপরাহ্ন, ২১ মে ২০২৬ | আপডেট: ৫:২১ অপরাহ্ন, ২১ মে ২০২৬
হোসেন আবদুল মান্নান
হোসেন আবদুল মান্নান

দু'দিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচিত্র সংবাদটি দেখলাম। অর্থাৎ একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছবিসহ বলা হল, কিশোরগঞ্জের যশোদল গ্রামে অবস্থিত সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনে সরকারি সিদ্ধান্তের পত্র পাওয়া গেছে। জানা যায়, বিদ্যালয়টি স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সংগঠক, মুজিব-নগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাঁর জন্মভিটা সংলগ্ন গ্রামে নিজেই প্রতিষ্টা করেছিলেন।

২. সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯২৫ সালে যশোদল দামপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ৫০ বছরের বর্ণাঢ্য ও মহমান্বিত এক রাজনৈতিক জীবন ছিল তাঁর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই তাঁর রাজনীতির হাতেকড়ি হয়েছিল। তিনি ১৯৪৭-৪৮ সালের দেশভাগের ঐতিহাসিক সময়ে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সহ- সভাপতি ছিলেন। ১৯৫১ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের লোভনীয় পদ ত্যাগ করে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে শিক্ষকতার মহৎ পেশায় যোগ দেন এবং '৫২ সালের 

আরও পড়ুন: আইনের শাসনের সংকট: অপরাধ যখন সমাজের প্রতিচ্ছবি

মাতৃভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

'৭১'র মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণ এবং অবদানের কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরে তৎকালীন  জাতীয় চার নেতার অন্যতম প্রধান হয়ে জীবন বিসর্জনের কাহিনিও বাঙালির জানা। এদেশের একজন আপাদমস্তক সুশীল, সজ্জন, অবিতর্কিত রাজনীতিকের সাক্ষাৎ  প্রতিকৃতি হিসেবে তাঁকে বিবেচনা করা হয়। 

আরও পড়ুন: কর, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও অর্থনীতির নতুন ভাষ্য: বাস্তবতা নাকি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস?

৩. এখানে নাম পরিবর্তনের হিড়িক পড়ে যায় মূলত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অব্যবহিত পর থেকেই। প্রথমদিকে অন্তর্বতী সরকারের প্রধান ড. ইউনূসকে দেশের মানুষ বুঝতে পারেনি। তাঁর কথাবার্তা, গতিবিধি ও বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে নিজের দেশ সম্পর্কে নানাবিধ আশাজাগানিয়া মন্তব্য করলেও কিছুদিনের মধ্যেই তা প্রকাশিত হতে থাকে ভিন্নতর রূপে। তিনিও তাঁর স্বরূপে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন জনগণমনে। মব ব্যাষ্টিত হয়ে তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ঠান্ডা মাথায় ধ্বংসের লীলায় মেতে ওঠেন। এমনকি ধীরে ধীরে অভিশপ্ত মব সৃষ্টির এক বিস্ময়কর কারখানার ফ্লাডগেট খোলে দেন তিনি। এদের দিয়ে, এদের মুখ থেকে বলিয়ে, এদের দ্বারা কৃত্রিম আন্দোলন সৃষ্টি করে প্রথমে জাতীয় ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতি ধ্বংস করা হয় এবং পরে পর্যায়ক্রমে নৈরাজ্যের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ, প্রতিষ্টান প্রধানদের ওপর  শারীরিক মানসিক নির্যাতন তথা নাম পরিবর্তনের সরকারি নির্দেশনা দিতে শুরু করেন। যার মাধ্যমে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও নাগরিকদের অনুভূতি বিষয়ে তাঁর নিজের  মনোজাগতিক হীনম্মণ্যবোধ প্রকাশ পায়। একইসাথে তিনি হয়ে ওঠেন দেশে প্রথম মব বা উশৃংখল জনতার নিরঙ্কুশ আশ্রয়স্থল। 

৪. তবে এ পরিবর্তন বিষয়ে একটি আশার কথাও নজরে আসে। যশোদলের সামান্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনে স্হানীয় জনগণ দলমত নির্বিশেষে এর বিরোধিতা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে দেখা গেল, কিশোরগঞ্জে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের একজন দায়িত্বশীল এবং বেশ প্রভাবশালী নেতা বলেছেন, সৈয়দ নজরুল ইসলামের হাতে প্রতিষ্টিত স্কুলটির নাম যেন কোনোক্রমেই পরিবর্তন না করা হয়। এটা বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক আদর্শ ও নীতির পরিপন্থী কাজ। যদিও তিনি এটাকে তাঁর ব্যক্তিগত মতামত বলে তা পাবলিক কমেন্টস এর আওতায় ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে তিনি সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ও অনুকম্পা লাভ করে চলেছেন। বর্তমানে জনগণের নির্বাচিত সহিষ্ণু ও সংবেদনশীল সরকারের কাছ থেকে সাধারণ জনতা এমনটাই প্রত্যাশা করে। এটা কখনো মবশাসিত বিতর্কিত পূর্ববর্তী অস্থায়ী সরকারের অনুসারী হতে পারে না। তাহলে ভোট দিয়ে ম্যান্ডেট প্রদানকারী দেশবাসী আরও একবার হতাশ হবে। তাছাড়া সৈয়দ নজরুল ইসলামের জন্মস্হানে তাঁর প্রতিষ্টিত একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করার মতন এমন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজে সরকারের মনোনিবেশ করার সময় কোথায়? সরকারকে কাজ করতে হয় বৃহত্তর জাতীয় এবং  আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে। 

৫. কিশোরগঞ্জের মানুষ হিসেবে ব্যক্তি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন ব্যাপক জনপ্রিয় নেতা। স্বাধীনতা পূর্বকালেই তিনি তাঁর এলাকায়  জাতীয় ব্যক্তিত্বের একক অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের শিল্পমন্ত্রী হিসেবে তিনি এই যশোদলের কাছাকাছি জায়গায় স্হাপন করেছিলেন কিশোরগঞ্জ টেক্সটাইল মিলস। যা দীর্ঘ সময় এলাকার মানুষের কর্মসংস্হান ও জীবিকার এক বড় অবলম্বন হয়ে ওঠেছিল। যদিও মিলটি এখন আর অস্তিত্ববান নেই। এখনো সেখানে  আবর্জনায় আকীর্ণ এর ভগ্নাংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। এসব গৌরবময় অতীত কর্মকান্ডই তাঁকে আজও সর্বজন শ্রদ্ধেয় করে রেখেছে। প্রসঙ্গত বলা যায়, যে মানুষটি স্বাধীন সার্বভৌম একটি জাতিরাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও প্রসব-বেদনার সঙ্গে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে আছেন, তাঁর প্রতিষ্টা করা স্কুলের নাম বদল করা হলে সে গ্রামটি কী অধিকতর মর্যাদাবান হবে? না-কি মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কিংবদন্তি হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলামের অপরিসীম অবদানে সামান্যতম কোনো হেরফের হবে? বলাবাহুল্য, ইতিহাস তার আপন কক্ষেপথ ধরে হেঁটে যায়। সে তার নিজস্ব ধারায় লিপিবদ্ধ করে যায় এক নৈর্ব্যক্তিক শিলালিপি। তার কোনো সহযোগী লিপিকার থাকে না। সে সত্য এবং স্বয়ংক্রিয়।  

৬. দেখলাম কোনো কোনো বেদনার্ত মন্তব্যকারী বলেছেন, দেশে, যেখানে হিমালয়সম স্হাপনা শেষ হয়ে গেল, সেখানে সামান্য একটা  স্কুলে নাম থাকার দরকার কী? বরঞ্চ সময়ের রাক্ষসী উদরে সবকিছু বিলীন হয়ে যাক। এখানে কারও নাম-ধাম-ঠিকানা এ-সব  থাকার প্রয়োজন নেই। পাথরের বুকে খোদাই করা চিহ্ন একদিন  মুছে যায়, সরে যায় দিনরাত্রির খেলায়। 

বাংলাসাহিত্যের অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের

একটা উক্তি দিয়ে শেষ করা যায়। 

"নদীর ভাঙ্গনে যাহার বহুতল অট্টালিকা বিলুপ্ত হইয়া গেল, সে কখনো দুই চারটি ইট রক্ষা করিতে

যাইবে না"। 

গল্পকার ও কলাম লেখক।