"রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ: তিন চ্যালেঞ্জের গোলকধাঁধায় নতুন সরকার"

Sadek Ali
শেখ এমদাদুল হক মিলন
প্রকাশিত: ১১:০২ পূর্বাহ্ন, ০৭ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১২:৪৪ অপরাহ্ন, ০৭ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

​একটি দেশের রাজনৈতিক পালাবদল এবং নতুন সরকারের প্রথম কয়েক মাস সবসময়ই একাধারে আশা এবং আশঙ্কার এক জটিল বুনন। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের শাসনভার এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের হাতে। রাষ্ট্রনায়কের "সাদামাটা জীবনযাপন" ও জনমুখী কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি দিলেও, সুশাসনের পথে চিরচেনা কাঁটা —যেমন দুই-একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা গুঞ্জন—ইতিমধ্যেই দেখা দিতে শুরু করেছে।

​তবে এই ঘরোয়া বিতর্ক ও গুঞ্জনের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো: সামষ্টিক অর্থনীতি, ভূরাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই ত্রিমুখী সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আসলে কোন দিকে যাচ্ছে?

আরও পড়ুন: আস্থা হারালে হারাবে অর্থনীতি: ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞা

​নিচে সত্যনিষ্ঠ সমালোচনা, সঠিক পরামর্শ এবং একটি কৌশলী পথরেখা বিশ্লেষণ করে বিশদ ও তথ্যসংবলিত মূল উপসম্পাদকীয়টি তুলে ধরা হলো:

​দীর্ঘ দুই দশক পর গণ-আকাঙ্ক্ষার ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে নতুন সরকার। জনমনে আশা ছিল ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথেই এক জাদুকরী পরিবর্তন আসবে। কিন্তু বাস্তবতার জমিন সবসময়ই তত্ত্বের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। আজ বাংলাদেশ এমন এক চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে, যার একপাশে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক বাস্তবতা, অন্যপাশে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির জটিল পাশাখেলা, আর পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চিরন্তন মেরুকরণ ও সুশাসনের অভাব।

আরও পড়ুন: সুন্দরবন সুরক্ষা: ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ব্লু কার্বন অর্থায়ন

​ অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি: সুড়ঙ্গের শেষে আলো নাকি গভীর খাদ?

​বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় ও প্রথম অগ্নিপরীক্ষা হলো দেশের অর্থনীতি। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) সাম্প্রতিক (২০২৬) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯% থেকে ৪.৭%-এর ঘরে নেমে এসেছে। এই মুহূর্তে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার মূল কারণ অস্থির মূল্যস্ফীতি (Inflation), যা এখনো ৮.৫%-এর ওপরে অবস্থান করছে।

​কঠোর সত্য ও সমালোচনা:

 বিদায়ী সরকারের রেখে যাওয়া অন্যতম বড় ক্ষত হলো ব্যাংকিং খাত। খেলাপী ঋণের (NPL) হার রেকর্ড ৩০.৬% ছাড়িয়েছে, যা পুরো আর্থিক খাতের তারল্য ও মূলধন সক্ষমতাকে পঙ্গু করে রেখেছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও ব্যাংকিং খাতের এই লুটপাট ও তারল্য সংকট ঠেকাতে কোনো দৃশ্যমান এবং সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এখনও নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে শুধু "আগের সরকারের আমলের ক্ষত" বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছে, যা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।

​এলডিসি (LDC) গ্র্যাজুয়েশন ও আরএমজি সংকট: ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটার কথা। এই উত্তরণ একদিকে যেমন গৌরবের, অন্যদিকে এর ফলে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা সংকুচিত হবে, যা আমাদের তৈরি পোশাক (RMG) খাতের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে। সরকার ইতিমধ্যে এই উত্তরণ কিছুটা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আলোচনা করছে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি যুগোপযোগী কৌশল হলেও  দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতির অভাব স্পষ্ট।

​মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-অর্থনৈতিক ধাক্কা: 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির। জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে বাংলাদেশের ওপর দ্বিগুণ চাপ পড়ছে—একদিকে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস গলফ কান্ট্রিগুলোতে স্থবিরতা এলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আবার টান পড়তে পারে।

​সরকারের জন্য সঠিক ও কৌশলী পথ:

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত "২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি" গড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে সাময়িক জনতুষ্টির নীতি পরিহার করতে হবে।

​ ১: অনতিবিক্ষণে ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন 'ব্যাংকিং রিফর্ম কমিশন' গঠন করে খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করতে হবে।

​২: এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের ধাক্কা সামলাতে শুধু পোশাক খাতের ওপর ভরসা না করে তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়াজাত পণ্য এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে কর ছাড় ও নগদ প্রণোদনা দিয়ে রপ্তানি ঝুড়ি বৈচিত্র্যময় করতে হবে।

​ভূরাজনীতি: আঞ্চলিক ভারসাম্যের দড়ি টানাটানি

​শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সাথে ঢাকার সম্পর্কের যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। উল্টো ভারতের আসাম বা পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বয়ানে বাংলাদেশ-বিরোধী বাগাড়ম্বর সম্পর্ককে আরও জটিল করছে। এর বিপরীতে, বেইজিং ও ওয়াশিংটনের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন নতুন সরকারের জন্য বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা।

​কঠোর সত্য ও সমালোচনা:

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের এক ধরনের সিদ্ধান্তহীনতা বা দোদুল্যমানতা স্পষ্ট। ভারতের সাথে সম্পর্কের বরফ গলাতে জোরালো কোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনা যেমন শুরু হয়নি, তেমনি ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের বিপরীতমুখী স্বার্থের মাঝখানে পড়ে বাংলাদেশ একটি ভূরাজনৈতিক দড়ি টানাটানির শিকার হচ্ছে। চীনের সাথে সামরিক ও অবকাঠামোগত সখ্য বাড়লেও, তা পশ্চিমা দেশগুলোকে কতটা আশ্বস্ত করতে পারছে—তা নিয়ে সরকার ধোঁয়াশায় রয়েছে।

​রোহিঙ্গা সংকট: 

মিয়ানমারের রাখাইনে আরাকান আর্মির সাথে জান্তা সরকারের চলমান লড়াইয়ের ফলে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ১২ লক্ষাধিক শরণার্থীর বোঝা বহন করা বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই একটি জীবন্ত টাইমবোম্ব, অথচ আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই সংকট সমাধানে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা খুবই ধীরগতির।

​ সরকারের জন্য সঠিক পরামর্শ ও কৌশলী পথ:

 ১: দিল্লির সাথে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত পারস্পরিক স্বার্থের (Reciprocal) ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে। ট্রানজিট সুবিধা অব্যাহত রাখার বিনিময়ে তিস্তা পানি বণ্টন এবং সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার শর্তে অনড় থাকতে হবে।

​ ২: আমেরিকার 'ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি' এবং চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ'—উভয় পক্ষ থেকেই সুবিধা নেওয়ার জন্য একচেটিয়া কোনো ব্লকের দিকে না ঝুঁকে 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়' নীতিতে অনড় থেকে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে জোর দিতে হবে।

​৩. অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সুশাসন: 

গুঞ্জন বনাম বাস্তবতা

​নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু ক্ষমতার এই বিশালতা কখনো কখনো স্বৈরাচারী মানসিকতা বা জবাবদিহিতাহীনতার জন্ম দেয়, যা ঠেকাতে সরকার কতটা প্রস্তুত—সেটাই দেখার বিষয়।

​কঠোর সত্য ও সমালোচনা:

 উপসম্পাদকীয়র সূচনাতেই যে গুঞ্জনের কথা বলা হয়েছে, তা কিন্তু অমূলক নয়। যেকোনো নতুন সরকারের প্রাথমিক সময় পার হতেই কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী ও আমলাতন্ত্রের একাংশ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমান সরকারের দুই-একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে পদোন্নতি, তদবির বানিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য এবং আত্মীয়করণ ও সিন্ডিকেট তৈরির তীব্র অভিযোগের গুঞ্জন উঠেছে। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত "সাদামাটা জীবনযাপন" যদি এই মন্ত্রীদের লাগাম টানতে না পারে, তবে তা পুরো সরকারের নৈতিক ভিত্তিকেই ধূলিসাৎ করে দেবে।

​আইন-শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পরমতসহিষ্ণুতা: অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার মব জাস্টিস বা আইন-শৃঙ্খলার যে শিথিলতা ছিল, তা থেকে দেশকে বের করে আনা এই সরকারের বড় সাফল্য। তবে জামায়াতে ইসলামী (যারা দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে) এবং ছাত্রনেতাদের দল ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টির (NCP) মতো উদীয়মান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার পরিপক্বতা সরকার এখনো দেখাতে পারছে না।

​ সরকারের জন্য যে সঠিক- কৌশলী পথে হাঁটতে হবে:

​ ১: প্রধানমন্ত্রীকে ঘরের ভেতর থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করতে হবে। যে দুই-একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুঞ্জন উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দিয়ে প্রকাশ্যে তদন্ত করিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে, যাতে বাকি আমলা ও মন্ত্রীদের কাছে শক্ত বার্তা যায়।

​ ২: বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর যৌক্তিক সমালোচনাকে স্বাগত জানাতে হবে। সংসদে ও সংসদের বাইরে তাদের স্পেস দিতে হবে, যাতে রাজপথের অস্থিতিশীলতা অর্থনীতির ক্ষতি করতে না পারে।

​উপসংহার: আমরা কোন দিকে যাচ্ছি?

​আমরা কি একটি টেকসই, প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী রাষ্ট্র হতে যাচ্ছি, নাকি আবারও সেই পুরনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মন্ত্রীদের সিন্ডিকেট ও লুণ্ঠনমূলক অর্থনীতির বৃত্তে পাক খাব?

​উত্তরটা নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর "সাদামাটা জীবনযাপনের" ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে কীভাবে পুরো সরকার ব্যবস্থায় ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তার ওপর। শুধু নেতার সততা যথেষ্ট নয় যদি না প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। অর্থনীতিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলী নিরপেক্ষতা এবং ঘরের মাঠে নিজের দলের ভেতরের আগাছা পরিষ্কার করে আইনের শাসন বজায় রাখতে পারলে বাংলাদেশ সামনের দিনে একটি উদীয়মান রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে। অন্যথায়, সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হলে বৈশ্বিক ফ্র্যাগমেন্টেশন বা খণ্ডিত ভূরাজনীতির নোংরা খেলায় আমরা কেবলই এক প্রান্তিক ভুক্তভোগী হয়ে থেকে যাব।