চরিত্রহীন মধ্যবিত্ত সমাজের আন্দোলন

Any Akter
দেলোয়ার হাসান
প্রকাশিত: ৪:১০ অপরাহ্ন, ১৬ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৪:১২ অপরাহ্ন, ১৬ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সচিবালয়ের ৬ নং ভবনের ১৮ তলার ফ্লোরে পা দিয়েই বুঝা গেল শিক্ষামন্ত্রী ডক্টর আ ন ম এহসানুল হক মিলন আজ অফিসে আসেননি। করিডোরের সোফায় ফাঁকা ফাঁকা-বসা দর্শনার্থী। গাদা গাদা না। কেচি গেটের পাশে নেই পুলিশ সদস্য। মন্ত্রী এবং সচিব মহোদয়ের দরজার সামনে নেই বদলি প্রত্যাশী শিক্ষকদের ভিড়। গত পাঁচ মাসে অন্তত দশবার গিয়েছি ১৮ তলার এই ফ্লোরে। কখনোই আজকের মত দর্শনার্থী মন্দা অবস্থা চোখে পড়েনি। অনেকটা অবাকই লাগলো বিষয়টা। বাঙালির অস্থির মন লাফ দিয়ে মনে করে দিল সন্দেহের অঙ্কুরোদগম। তাহলে কি কিছু একটা হয়ে গেল। শিক্ষামন্ত্রী নাই। তাই তিনি আসছেন না। অতীতে প্রতিমন্ত্রী থাকার সময়ও একবার এমন হয়েছিল। কদিন আগে শুনছিলাম প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা মন্ত্রীকে তলব করে নসিহত করেছেন। 

করিডোরে এসকালার সোফায় বসে মোবাইল স্ক্রিনে ফেবু খুলতেই দুঃখের সব খবর ছবি ভাসতে শুরু করেছে। ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগে বান ডেকেছে ছাত্রদের আন্দোলন। ঢাকাসহ সকল বিভাগীয় শহরেই পুলিশের সঙ্গে বাক বিতন্ডা চলছে মিলন বিরোধী আন্দোলনকারী। বরিশালের আন্দোলনের ছবি মেসেঞ্জারে পাঠিয়েছেন আমার এক লেখক বন্ধু। পরিচিত অনলাইন সাংবাদিক বন্ধু পলাতক নেতা ওবায়দুল কাদেরকে উল্লেখ করে পোস্ট দিয়েছেন সরকারের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। একজন মন্তব্য লিখেছেন, মাটি সরে নৌকায় উঠছে। আরেকজন লিখেছেন জিএম কাদের বলেছেন, এ সরকারকে বিশ্বাস করা যায় না। একজন মন্তব্য করেছেন জিএম মানে কি গোলাম মোহাম্মদ না গোয়া মারা। ঢাকার মিরপুরের রাজনৈতিক নেতা এস এ খালেকের ভাবশিষ্য সসসদ (সব সময় সরকারি দল) দলের অনেকেই নেমে পড়েছেন মিলন বিরোধী আন্দোলনে।  

আরও পড়ুন: ওয়েস্টমিনস্টার মডেল: গণতন্ত্রের আড়ালে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ

কয়েক ঘন্টার মধ্যে বিশ্বকাপ ফুটবলের দারুন দারুন উত্তেজনাকর খবর ও খেলার ছবি এবং ইরান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের খবরাখবর তুলে ফেসবুক দখল করে নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগ আন্দোলন? বিএনপির মন্ত্রী ও এমপিদের পালিত ইউটিউবাররাও ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করতে চাচ্ছেন না শিক্ষা মন্ত্রীর। সুযোগ সন্ধানীরা মিডিয়া কার্ড ব্যবহার করে এক হাত নিচ্ছেন মিলনের। যেন বাংলাদেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অযোগ্য শিক্ষামন্ত্রী মিলন। কিছু ছাত্রছাত্রীর লাইভ দেখে মনে হল এরাও দূর ভবিষ্যতে শিল্পী রাজনীতিক মমতাজের গানের ও দেহ-মনের গুণ অর্জন করবে। 

দেশে বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের দলদাস বুদ্ধিজীবীদের মন্তব্যে মনে হলো পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রী পরিষদ সদস্যদের নতুন মুজিব কোর্ট পরিয়ে আগরতলায় বর্ডারে অপেক্ষমান। টুক করে ঢুকে পড়বেন। ওবায়দুল কাদের আসাদুজ্জামান কামাল শেখ সেলিম ব্যারিস্টার তাপস এসেই টপাটপ বসে যাবেন চেয়ারে? উকা কাকা হুংকার দিয়ে বলবেন-আমরা পালাইনি। বেড়াতে গিয়েছিলাম।

আরও পড়ুন: ন্যাটো ৩.০: আঙ্কারা থেকে আর্কটিক, হরমুজ থেকে বঙ্গোপসাগর—নতুন বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্র কোথায়?

খবর নিয়ে জানলাম শিক্ষামন্ত্রী কিছুটা অসুস্থ। আজ সচিবালয়ে তিনি আসছেন না। গেলাম সচিব সাহেবের কক্ষের দিকে। ওখানকার অবস্থা শোচনীয়। কেউ নেই। কারণ সচিব স্যার নেই। মন্ত্রীর অনুপস্থিতি নির্ধারিত মিটিং চালিয়ে যাচ্ছেন সচিব। সিদ্ধান্ত নিলাম প্রেসক্লাবে দুপুরের খাবার সেরে কাঁটাবনের বই পাড়া হয়ে মন্ত্রীপাড়ায় যাব শিক্ষা মন্ত্রীর বাসায়। তিনি বাসায় আছেন।

সচিবালয় থেকে বের হয়ে প্রেস ক্লাবে আগেভাগে ডাল ভাত খেয়ে রওনা দিলাম কাঁটাবনের উদ্দেশ্যে। কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই মেঘলা বাসে চলে আসলাম কাঁটাবন। ছোট ছোট দু-তিনটি কাজ সেরে অফিস ছাড়লাম মিন্টু রোডের জন্য। কিন্তু উপায় নেই। কাঁটাবন ব্লকড। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগের এক দফার আন্দোলন। কোথাও কোথাও আন্দোলনকারীরা রাস্তায় বসে পড়েছে। শুয়ে পড়েছে কেউ কেউ। সরকারকে হুমকি দিচ্ছে শিক্ষামন্ত্রীকে বাদ না দিলে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যাবেন তারা। 

প্রায় সপ্তাহ জুড়েই পরিচিত বাতাস ফিসফিস করছিল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ বিষয়টি। শুধু শিক্ষামন্ত্রী না মীর শাহ আলমসহ আরও পাঁচ সাত মন্ত্রী বাদ পড়ছেন এমন গুরুত্বপূর্ণ খবরে চোখ ও কান ঝালাপালা করছিল। সামাজিক যোগাযোগ ও প্রেস ক্লাবের পরিচিতদের এবং বঞ্চিত বিএনপির সূত্রে এসব খবর ধুম্রজালের সৃষ্টি করলেও  অথেনটিক কোন সূত্রেই খবরটি নিশ্চিত করে নি। যাঁদের নামে এই খবর শিক্ষামন্ত্রী তাঁদের মধ্যে বেশি এগিয়ে। 

এর পেছনের কারণ অনেক। তা বিএনপির দলীয়রাও জানেন। আর মিলন সাহেব কে যেদিন এই পদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমান অর্পণ করেছেন সেই দিনই পাঁচ শতাংশ শিক্ষার্থী পনের শতাংশ শিক্ষক এবং মন্ত্রণালয়ের আসাধু কর্মকর্তা কর্মচারী কোমর বেঁধেছে শিক্ষামন্ত্রীর বিপক্ষে। আর অটোপাশের সমর্থক ও অনিয়ম করে কতিপয় ধনীর দুলালের জিপিএ ফাইভ কনফার্ম করার. প্রশ্নপত্র অনিয়ম সঙ্গে জড়িত. কোচিং ব্যবসায়ীসহ সংঘবদ্ধ একটি চক্র এবং পলাতক আওয়ামীলীগের একাংশ ও হঠাৎই ভুলে যাওয়া বুদ্ধিজীবীরা চেয়েছিল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবির মধ্যে দিয়ে বিএনপির সরকারকে একটি ধাক্কা দিতে।

আমার কাছে অবাক লাগল জলাবদ্ধতার জন্যে এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভুল তথ্যের জন্য শিক্ষার্থীদের এবং নগরবাসীর সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ঐদুটি বিভাগের ব্যর্থতা ও ভুলের বিচার দাবি না করে আমরা বাচ্চাদের রাজপথে নামালাম শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে। মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আন্দোলনকারীরা বলতে চাইলেন সরকারের বিরুদ্ধে।

বছরের পর বছর বিপুল বরাদ্দ পায় স্থানীয় সরকার বিভাগ। ঢাকাসহ সব কটি সিটি মেয়র কতটাকা খরচ করে তা ফেরেস্তারাও জানে না। হিট ফিট কিট কত খাতে কত শত কোটি খরচ আল্লা মালুম। আমাদের নক্ষত্র নয়নের সাংবাদিক সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের কেউ একজন দাবি করলেন না নগরপিতাদের ব্যর্থতার কথা। ভদ্রলোক নগর পিতারা বললেন না জলাবদ্ধতার অবসান না করার জন্য তারা দায়ি। সকলের চোখে পড়ল কোমর সমান পানির নিচে গর্তের ভেতর শিক্ষার্থীর পড়ে যাওয়ার দৃশ্য। কিন্ত রাজধানীর রাজপথে গভীর গর্ত থাকবে কেন। স্বাধীনতার ৫৬ বছর পরেও আমাদের উন্নয়নের এই হাল কেন। আর রাজধানীর চিত্র যদি এই হয় তবে গ্রামের চিত্রটা অনুমান করা যায়। টানা সতের বছর ক্ষমতায় ছিল আওয়ামীলীগ। ভুমিধ্বস উন্নয়নের জোয়ারে দেশ ভাসিয়ে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। তারপরও তলায় রাজধানী। আগে ছিল বিএনপি ।তার আগে বিশ্ব বেহায়া এরশাদ। তারা কি করলেন। এক আন্দোলনেই বা আমাদের কি হলো।  

তবে একথাও সত্য যেহেতু আপনি বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী সুতরাং আপনারকে অবশ্যই অসুন্দর ও বাহুল্য শব্দ ও বাক্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। এদেশের অধিকাংশ মানুষের বিশ্বাস আপনার উপর আছে। আপনার আশেপাশে এখনও ধর্মান্ধ বুদ্ধিজীবী লুটপাটকারী ব্যবসায়ী ও তোষামোদ কারীদের আনাগোনা। এগুলো থেকেও বের হয়ে আসতেই হবে। কারণ পুরো জাতীর শিক্ষার ভার আপনার উপর। আমাদের গর্বিত জাতি গড়ার মেন্টর আপনি।

আন্দোলনকারীরা ভুল করেছেন। একজনের অপকর্মের বিচারে অন্যের ফাঁসি চাইছেন তা কি হয়? 

আমার মনে পড়লো ডঃ মোঃ শহিদুল্লাহর শংসা প্রাপ্ত প্রয়াত গবেষক ময়মনসিংহের কৃতি সন্তান গোলাম সামদানি কুরাইশি স্যারের কথা। তখন মাঝেমধ্যে ময়মনসিংহ শহরের আকুয়া দক্ষিণপাড়া স্যারের বাসায় যেতাম। উদ্দেশ্য কিছু জানা। জ্ঞান আহরণ। সময়টা এরশাদী জামানায়। সামদানী স্যার ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে টাইটেল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। এইচএসসি পরীক্ষায় সারা দেশে প্রথম হয়েছিলেন স্যার। স্যারের অনেক বই। স্যার একদিন বললেন, যথার্থ অর্থে আমাদের শাসন করবার কেউ নেই। 

চরিত্রহীন মধ্যবিত্ত সমাজ নিজেরা নিজেদের শাসন করতে পারছে না। সমাজকে শাসন করবার তো প্রশ্নই উঠে না। তাই চতুর্দিকে কেবল শোষণের মাত্রা বাড়ছে। কারণ বর্তমানে এ সমাজে ক্ষমতাবান লোকের অর্থই হচ্ছে শোষণের অধিকার লাভ এবং নিরাপদ করার জন্য শাসন পরিচালনা। আর তাই কমছে না বাস্তহারা দরিদ্র মানুষের স্রোত। আদমশুমারিতে এদের স্থান থাকলেও জীবন জীবিকার কোথাও এদের ঠাঁই নেই। 

এজন্য আমরা বিদেশি শাসক ও শোষকদের দোষারোপ করেছি। সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই এমনি দোষারোপের এমন ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল। মুঘল ব্রিটিশ এমন কি পাকিস্তানি আমলেও এই ঐতিহ্যের অনুসরণ আমাদেরকে আত্মবিশ্বাসের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে। এর ফলে আমাদের উপলব্ধিগত দৈন্য ও চরিত্রগত সুবিধাবাদের মধ্যে কোন ব্যত্যয়ের সৃষ্টি হয়নি। শংকর জনগোষ্ঠীর নিম্ন স্বার্থপরতাই আমাদের প্রায় সকলের চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। 

আমরা ধর্ম ও ভাষাবাবাদে দেশ কোন প্রকার বন্ধন সূত্রেই একে অপরের জন্য স্বার্থত্যাগের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারিনি। তাই মুক্তিযুদ্ধ আমাদেরকে বিদেশিদের প্রত্যক্ষ শাসন থেকে মুক্ত করলেও শোষণ থেকে মুক্তি দিতে পারেনি। আমরাই আমাদের লোভ লালসা চরিতার্থ করার জন্য বারবার একের বদলে অন্যকে ডেকে এনেছি এবং তাদের সহযোগী হয়ে শাসন ও শোষণের সেই আদিম ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে চলেছি। 

কিছুদিন পর স্যারের এ কথাগুলো কলেবর আকারে ময়মনসিংহের জীবন ও জীবিকা প্রবন্ধে স্থান পায়। 

লেখক পরিচিতি : লেখক,  প্রকাশক ও সিনিয়র সাংবাদিক   লেখক,  প্রকাশক ও সিনিয়র সাংবাদিকলেখক,  প্রকাশক ও সিনিয়র সাংবাদিকলেখক,  প্রকাশক ও সিনিয়র সাংবাদিক লেখক,  প্রকাশক ও সিনিয়র সাংবাদিক