বাংলাদেশ: মরীচিকার পেছনে এক লক্ষ্যহীন যাত্রা

Sanchoy Biswas
এম এ মতিন
প্রকাশিত: ৭:৫৩ অপরাহ্ন, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৯:০৯ অপরাহ্ন, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি ছিল ভাষা ও সংস্কৃতি। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর এসে আজ গভীর প্রশ্ন জাগে, যে ‘বাংলা’ রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা এনে দিয়েছিল, যে ‘বাংলা’ একটি স্বাধীন মানচিত্রের জন্ম দিয়েছিল, সেই বাংলা আজ কেবলই কি উৎসবের আবেগ নাকি এক লক্ষ্যহীন গোলকধাঁধা? আজ একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি এক গভীর ও অভূতপূর্ব মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও কাঠামোগত সংকটের মুখোমুখি। আপাতদৃষ্টিতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর অর্থনৈতিক সূচকের চাকচিক্য থাকলেও, ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং জাতীয় গন্তব্যের অস্পষ্টতা রাষ্ট্রটিকে এক ভাসমান ও দিকভ্রান্ত নৌকার মতো দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একেই হয়তো বলা যায় বিব্রান্ত দিশাহারাএক জাতি । ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের আত্মোপলব্ধি এবং সংকটের ব্যবচ্ছেদ করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

১. পরিচয়ের সংকট: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার টানাপোড়েন

আরও পড়ুন: ৪৮তম জন্মবার্ষিকীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতি নিবেদিত কাব্য

একটি জাতি তখনই দিকভ্রান্ত হয়, যখন তার সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সামগ্রিক পরিচয় সংকটে রূপ নেয়। বাংলাদেশের বর্তমান তরুণ প্রজন্ম এক চরম মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সংস্কৃতি ও ভাষা, অন্যদিকে গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের তীব্র হাওয়া। এই দুইয়ের মাঝে পড়ে জাতি আজ নিজস্ব স্বকীয়তা হারাতে বসেছে।

  • ভাষার অবক্ষয় ও প্রান্তিকতা: ফেব্রুয়ারি মাস এলে আমরা ভাষার জন্য আবেগাপ্লুত হই, রাজপথ আলোড়িত করি। কিন্তু বছরের বাকি দিনগুলোতে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার সঠিক প্রয়োগ, গবেষণা ও মর্যাদা রক্ষায় আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো মাথা ব্যথা থাকে না। উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা এবং করপোরেট সংস্কৃতিতে বাংলা আজ এক প্রকার প্রান্তিক ভাষা। ইংরেজি ও বাংলার মিশেলে তৈরি ‘বাংলিশ’ সংস্কৃতির আগ্রাসন ভাষাটিকে তার গাম্ভীর্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
  • শিক্ষাব্যবস্থার ত্রিমুখী বিভাজন: দেশে দীর্ঘ সময় ধরে তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা (বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসা) সমান্তরালভাবে চালু থাকায় একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটছে না। প্রতিটি ধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিশ্ববীক্ষা ও জীবনবোধ তৈরি করছে। ফলে, একদিকে দেশের প্রতি টানহীন এক শ্রেণির সুযোগ সন্ধানী সুবিধাবাদী গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে যারা প্রথম সুযোগেই মেধা পাচার (Brain Drain) করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরেই তৈরি হচ্ছে চরম মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক বিভাজন। জাতি হিসেবে আমাদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী, আমরা ঠিক কোন দিকে যাচ্ছি—তা তরুণ প্রজন্মের কাছে আজ সম্পূর্ণ কুয়াশাচ্ছন্ন।

২. প্রাতিষ্ঠানিক পঙ্গুত্ব এবং সুশাসনের অভাব

আরও পড়ুন: বিদ্যুতের আলোয় উন্নয়নের গল্প, আর অন্ধকারে সাধারণ মানুষের বাস্তবতা

কোনো দেশ কেবল ভূখণ্ড বা ভাষার আবেগের জোরে রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে পারে না; তার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী, স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের প্রধান প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক দশকে দলীয়করণ এবং স্বৈরাচারী মানসিকতার চরম শিকারে পরিণত হয়েছে।

বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, সিভিল প্রশাসন থেকে শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—প্রতিটি ক্ষেত্রই আজ সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি হারিয়েছে। যখন একটি দেশের নাগরিকেরা নিজেদের মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায়ের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর ভরসা করতে পারে না, তখন সেখানে চরম সামাজিক নৈরাজ্য এবং ‘মব জাস্টিস’-এর মতো বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়।

আইনের শাসনের অনুপস্থিতি এবং জবাবদিহিতাহীন ক্ষমতার চর্চা সমাজকে একটি গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ক্ষমতার রদবদল ঘটলেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির কোনো গুণগত পরিবর্তন হয় না; বরং এক শোষকের স্থলে অন্য শোষকের পুনরুত্থান ঘটে। সুশাসনের এই চরম আকালই রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।

৩. অর্থনৈতিক বৈষম্য ও মরীচিকার উন্নয়ন

আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়ের ঊর্ধ্বমুখী খতিয়ান এবং দৃশ্যমান মেগা প্রজেক্ট নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে যে বয়ান তৈরি করা হয়েছিল, তা আজ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। বাংলাদেশের তথাকথিত উন্নয়ন মডেলটি আসলে একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক মরীচিকা, যা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করলেও আমজনতাকে নিঃস্ব করেছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের বৈপরীত্য 

প্রচারিত রাষ্ট্রীয় বয়ান (Myth) , বাস্তব নিষ্ঠুর চিত্র (Reality) 

  • মেগা প্রজেক্ট ও ফ্লাইওভারের চাকচিক্য
  • ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ও পঙ্গুত্ব
  • মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির গাণিতিক দাবি
  • আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি ও রেশনের লাইন
  • মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার গৌরব
  • ব্যাপক অর্থ পাচার ও রেকর্ড বেকারত্ব  

এই অর্থনৈতিক মডেল সমাজে এক চরম 

ক্ষোভ ও দীর্ঘস্থায়ী হতাশার জন্ম দিয়েছে। মেগা প্রজেক্টের আড়ালে যে মেগা দুর্নীতি, ক্রনি ক্যাপিটালিজম (Crony Capitalism) এবং লাখ লাখ কোটি টাকার অর্থ পাচার হয়েছে, তার মাশুল আজ সাধারণ জনগণকে প্রতিদিন বাজারে গিয়ে দিতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বমূল্যের বাজারে টিকে থাকার জন্য প্রতিদিন এক অসম যুদ্ধ লড়ছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি আজ কোনো সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী রোডম্যাপ ছাড়া, কেবল জোড়াতালি ও বৈদেশিক ঋণের ওপর ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে

৪. বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব এবং মেরুকরণের রাজনীতি

একটি জাতিকে সংকটের সময়ে সঠিক পথ দেখানোর মূল দায়িত্ব থাকে দেশের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, লেখক ও সাংবাদিকদের ওপর। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ আজ সম্পূর্ণভাবে নৈতিকভাবে দেউলিয়া এবং রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত। নিরপেক্ষ সত্য বলার সাহস ও মেরুদণ্ড আজ প্রায় বিলুপ্ত।

  • চাটুকারিতার সংস্কৃতি: যেকোনো সরকারের আমলে বুদ্ধিজীবীদের একাংশ ব্যস্ত থাকে ক্ষমতার তোষামোদি এবং আখের গোছাতে। ভিন্নমতের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সম্মিলিত কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না, কারণ প্রত্যেকেই নিজের দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত।
  • অসহিষ্ণু মেরুকরণ: রাজনীতিতে সুস্থ ধারার চর্চা না থাকায় এবং ক্ষমতার লোভ ও প্রতিহিংসার ফলে সমাজ আজ চরমভাবে মেরুকৃত। এখানে 'হয় তুমি আমার পক্ষে, না হয় তুমি আমার শত্রু'—এই বিপজ্জনক বাইনারি দিয়ে সবকিছু বিচার করা হয়। সংলাপে বসার বা সুস্থ বিতর্কের কোনো জায়গা আজ সমাজ ও রাষ্ট্রে অবশিষ্ট নেই। এই চরম রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা একটি সমাজকে ভেতর থেকে পচিয়ে দেয়, যা আজ বাংলাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দৃশ্যমান।

৫. গন্তব্যহীন দিকদর্শন : উত্তরণের উপায় কী?

বাংলাদেশ আজ যে বিপজ্জনক মোহনায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে কেবল ভাষার আবেগ কিংবা ক্ষণিকের ক্ষোভ প্রকাশ করলে চলবে না। আমাদের প্রয়োজন এক বাস্তবমুখী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় রূপরেখা। এই বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য:

  • জাতীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতাকরণ: বিচার বিভাগ, দুদক এবং নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধা ও সততাকে প্রাধান্য দিয়ে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব চিরতরে দূর করতে হবে।
  • একমুখী শিক্ষানীতি ও মেধা মূল্যায়ন: শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগের উপযোগী ও প্রযুক্তিবান্ধব করার পাশাপাশি নৈতিকতা ও জাতীয় মূল্যবোধের মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মুক্তচিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করে মেধা পাচার রোধ করতে হবে।
  • লুটেরা অর্থনীতির অবসান: ব্যাংকিং খাতের কঠোর সংস্কার, খেলাপি ঋণ সংস্কৃতি বন্ধ এবং অর্থ পাচারকারীদের ট্রায়াল করে সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক অর্থনীতি বাদ দিয়ে বণ্টনমূলক অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করতে হবে।
  • রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত রূপান্তর: প্রতিহিংসা ও বর্জনের রাজনীতি পরিহার করে সব পক্ষকে নিয়ে একটি বহুত্ববাদী ও পরমতসহিষ্ণু গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। সংবিধানে ক্ষমতার ভারসাম্য (Checks and Balances) আনা জরুরি, যাতে কোনো ব্যক্তি বা দল স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে।

বাংলাদেশ কোনো হারিয়ে যাওয়া বা ব্যর্থ ভূখণ্ড নয়, এর রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল রক্তস্নাত ইতিহাস। কিন্তু অতীত গৌরব নিয়ে ক্রমাগত আত্মতুষ্টিতে ভোগা আর বর্তমানের নগ্ন বাস্তবতাকে অস্বীকার করা এক জিনিস নয়। আমরা যদি এখনও আমাদের যৌথ ভুলগুলো স্বীকার না করি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে হাত না দিই এবং জাতীয় গন্তব্য সুনির্দিষ্ট না করি—তবে দিশাহীন বাংলাদেশের এই তকমা আমাদের চিরকাল তাড়া করে বেড়াবে। বাংলার আকাশ, বাতাস আর ভাষার যে অমিত শক্তি, তাকে কেবল আনুষ্ঠানিক উৎসবে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবেই এই জাতি তার হারানো কম্পাস খুঁজে পাবে এবং লক্ষ্যহীন মরীচিকা থেকে মুক্ত হয়ে এক সাম্য ও ইনসাফভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।