জুলাই সনদের এক বছর: সংস্কারের অঙ্গীকার, বাস্তবায়নে ধীরগতি

Shahrier Islam Pallab
আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: ৯:১২ অপরাহ্ন, ২০ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১০:৩৭ অপরাহ্ন, ২০ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • গণভোটের রায়, বাস্তবায়নে জট
  • বিচার বিভাগ ও দুদক সংস্কারে প্রশ্ন
  • সংবিধান সংশোধন নিয়ে মতপার্থক্য
  • রাজনৈতিক সমঝোতায় বড় চ্যালেঞ্জ

রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের এক বছর পেরিয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছিল এই সনদ। কিন্তু এক বছর পরও এর গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও অনিশ্চয়তা কাটেনি। সরকার বলছে, সনদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, গণভোটে পাওয়া জনসমর্থনের প্রতিফলন ঘটানোর পরিবর্তে সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যে সীমিত রাখার চেষ্টা চলছে।

২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করে। দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে তৈরি এই সনদে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ, দুর্নীতি দমনসহ রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়। সনদের মূল লক্ষ্য ছিল- রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বাধীন, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা দলের হাতে ক্ষমতা অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত না হয়। কিন্তু রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে সংস্কারযাত্রা শুরু হয়েছিল, বাস্তবায়নের পথ নিয়ে মতভেদের কারণে তা এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে।

আরও পড়ুন: রাজধানী ঢাকা শহরকে অচল করে তুলতে মরণফাঁদ অটোরিকশাই যথেষ্ট

গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবের মধ্যে ৩৮টিতে সমর্থন আসে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গণভোটের রায় কীভাবে সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামোয় কার্যকর করা হবে, তা নিয়েই সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে। সরকার বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার পক্ষে। বিরোধী দলগুলোর একটি অংশের দাবি, গণভোটে অনুমোদিত প্রস্তাব বাস্তবায়নে পৃথক সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনসহ সনদে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। ফলে সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে একমত থাকলেও বাস্তবায়নের পথ নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা এখনও তৈরি হয়নি।

সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি কাজ করছে। কমিটির মাধ্যমে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। গত ১৩ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দলের অংশগ্রহণসহ ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংশোধনী আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে বিরোধীরা অংশ না নিলেও সরকার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে। এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, সনদ স্বাক্ষরের সময় বিভিন্ন দলের দেওয়া ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। সরকারের এই অবস্থান থেকে সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ স্পষ্ট হলেও বিরোধীদের সঙ্গে মতপার্থক্য নিরসন না হলে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী: জ্ঞানের দীপ্তি, নৈতিকতার শক্তি ও নেতৃত্বে আগামী প্রজন্ম গঠনের এক অনন্য অভিযাত্রা

সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির ১৬ অক্টোবরের বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি, আমলাতান্ত্রিক প্রভাব এবং ক্ষমতার রাজনীতি রাষ্ট্র সংস্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা কিছু অধ্যাদেশ বাতিল বা স্থগিত হওয়ায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি জোরদারের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট আইনের বর্তমান অবস্থাও পূর্ণাঙ্গভাবে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কারণ, সংস্কারের অগ্রগতি মূল্যায়নে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি কোন আইন কার্যকর আছে, কোনটি পরিবর্তিত হয়েছে এবং কোন প্রস্তাব এখনও প্রক্রিয়াধীন- তার নির্ভরযোগ্য হিসাব প্রয়োজন।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এ বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া পদক্ষেপগুলোর ধারাবাহিকতা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। টিআইবির মতে, এসব উদ্যোগ বাতিল বা পিছিয়ে যাওয়ায় বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা শক্তিশালী করার সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একইভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনগত কাঠামো এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ তুলেছে সংস্থাটি। এসব ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো, প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করার মতো আইনি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে কি না।

পুলিশের জবাবদিহি, নির্বাচনব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং সংসদে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাও সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন শুধু আইন সংশোধনের ওপর নির্ভর করে না; প্রয়োজন কার্যকর প্রয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার। নতুন আইন প্রণয়ন করেও যদি প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে যায়, তাহলে সংস্কারের ঘোষিত উদ্দেশ্য অর্জিত হবে না। একইভাবে সংস্কার নিয়ে বিরোধ থাকলে তার সমাধানও হওয়া প্রয়োজন স্বচ্ছ আলোচনা ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায়।

রাষ্ট্র সংস্কারের গতি নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি সরকারের সামনে রয়েছে রাজনৈতিক ঐকমত্য ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। জুলাই জাতীয় সনদ কোনো একক দলের কর্মসূচি নয়; এটি বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির আলোচনার মধ্য দিয়ে তৈরি একটি সমঝোতার দলিল। ফলে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এক পক্ষের অবস্থান অন্য পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে বিরোধের বিষয়গুলো স্পষ্ট করা, আইনি ব্যাখ্যা প্রকাশ করা এবং সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা জরুরি। বিশেষ করে কোন প্রস্তাব সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে, কোনটি সাধারণ আইন প্রণয়ন করে এবং কোনটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে- তার সুস্পষ্ট তালিকা জনসমক্ষে থাকা প্রয়োজন।

সনদের এক বছর পূর্তিতে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু সংস্কার হচ্ছে কি না, তা নয়; বরং প্রতিশ্রুত সংস্কারের কোনটি কত দূর এগিয়েছে এবং বাকি কাজ শেষ করার পরিকল্পনা কী। সরকারের ঘোষিত অঙ্গীকারের সঙ্গে বাস্তব অগ্রগতির তুলনামূলক হিসাব প্রকাশ করা গেলে বিতর্কের জায়গা কমবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোরও উচিত হবে নির্দিষ্ট প্রস্তাব ও বাস্তবায়নপদ্ধতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়া, যাতে মতপার্থক্য সংস্কারপ্রক্রিয়াকে অচল করে না দেয়।

জুলাই জাতীয় সনদের রাজনৈতিক গুরুত্ব শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে তার বাস্তব ফল দিয়ে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীন হলো, ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো, দুর্নীতি দমনে জবাবদিহি কতটা বাড়ল এবং নাগরিকের অধিকার কতটা সুরক্ষিত হলো- এসবই হবে সংস্কারের সাফল্য পরিমাপের মানদণ্ড। প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যকার ব্যবধান দীর্ঘ হলে জনআস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে দৃশ্যমান অগ্রগতিতে রূপ দেওয়া, স্বচ্ছ সময়সীমা ঘোষণা করা এবং জনগণের সামনে সংস্কারের অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা।