মহানবমীতে চলছে দেবীর আরাধনায় বিদায়ের আবহ
রাজধানীসহ সারাদেশে মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তি-সম্প্রীতির বার্তা
মহানবমীতে রাজধানী ঢাকার মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর বিদায়ের বিষাদময় সুর বেজে উঠেছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মূল আচার-অনুষ্ঠানের শেষ দিন হওয়ায় ভক্তদের মনে আনন্দের পাশাপাশি আনন্দ-বেদনার এক মিশ্র আবহ তৈরি হয়েছে।
আজ বুধবার দেবীকে শেষবারের মতো প্রাণভরে দর্শন করবেন ভক্তকুল। কারণ পরদিনই ভক্তদের কাঁদিয়ে কৈলাসে ফিরে যাবেন দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গা। তাই মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে দেবী দুর্গার ভক্তি, আরাধনা। একইসঙ্গে আনন্দঘন মুহূর্তে ভক্তরা প্রার্থনা করেন দেবী দুর্গার আশীর্বাদে পৃথিবী হয়ে উঠুক শান্তিময়। মানুষের মধ্যে দূর হোক সব বিভেদ, প্রতিষ্ঠিত হোক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে নবমীর পূজা ও অন্যান্য ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এদিন সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয় মহাআরতি। পাশাপাশি নবমী হোমসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিয়েছেন পূজারি ও ভক্তরা।
এদিন শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমীতে পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি নিবেদন, প্রসাদ বিতরণ ও নানা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে দিনটি উদ্যাপন করছেন ভক্তরা। মহানবমীর পূজা ঘিরে মণ্ডপে মণ্ডপে যেমন দেখা যাচ্ছে ভক্তদের আনাগোনা, তেমনি উৎসবের শেষলগ্নে অনুভূত হচ্ছে দেবীর বিদায়ের আবহ। এরইমধ্যে রাজধানীর মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির কেন্দ্রবিন্দু শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, মেলাঙ্গনসহ দেশজুড়ে মণ্ডপে মণ্ডপে সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে শ্রীশ্রী দুর্গাদেবীর মহানবমী কল্পারম্ভ ও মহানবমী বিহিত পূজা, এরপর মধ্যাহ্নে বিভিন্ন মণ্ডপে ভক্তদের মাঝে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হবে। নবমীর সন্ধ্যায় ঐতিহ্যবাহী আরতি প্রতিযোগিতা এবং ধূপ-দীপের সমারোহে মণ্ডপগুলোতে এক আবেগঘন উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হবে।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরকে ওএসডি
সনাতন ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, নবমী পূজাই দুর্গাপূজার মূল আচার-অনুষ্ঠানের শেষ দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরের দিন কেবল বিসর্জন ও দেবী বিদায়ের পালা। ফলে নবমীর গভীর রাতে মণ্ডপে মণ্ডপে বিদায়ের করুণ সুর বেজে ওঠে। শারদীয় উৎসবের বিদায়লগ্নে রাজধানীর প্রতিটি মণ্ডপে সকাল থেকেই ভক্ত-পুণ্যার্থীদের ঢল নেমেছে। অঞ্জলি প্রদান, গঙ্গাজল, শুদ্ধ বস্ত্র, পুষ্পমাল্য, চন্দন ও ধূপদীপের সুবাসে মণ্ডপগুলো মুখরিত, মন্ডডগুলো।
ভক্তরা কাঙ্ক্ষিত চরণে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে বিশ্বজনীন মঙ্গল ও শান্তি কামনা করছেন। এরআগে মহাষ্টমীর দিনে রাজধানীসহ দেশের নানা স্থানে উদ্যাপিত হয় কুমারী পূজা। বিশেষ করে রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠে কুমারী মায়ের আরাধনা দেখতে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। উলুধ্বনি, ঢাকের বাদ্য আর শঙ্খধ্বনিতে পুরো উৎসব এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে।
এদিকে, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়কে শুভেচ্ছা জানিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মণ্ডপ সুরক্ষার বার্তা দিয়েছেন। দুর্গাপূজার সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পূজা মণ্ডপগুলোতে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেজন্য বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা স্থানীয় পর্যায়ে মণ্ডপ পাহারা দেওয়ার ঘোষণা দেন এবং মাঠে সক্রিয় ছিলেন।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম গোলাম পরওয়ারসহ স্থানীয় জামায়াত নেতাদের ভূমিকা ও সহযোগিতা নিয়ে সনাতনী নেতৃবৃন্দ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং প্রশংসা করেছেন। শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে চট্টগ্রামের লোহাগাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন বিএনপি ও স্থানীয় নেতারা। তবে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে আয়োজিত প্রস্তুতিমূলক সভায় স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছু উত্তেজনা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে, যা পরে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে নিয়ন্ত্রণে আসে। বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, তারা সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার ও পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ভবিষ্যতে তারা সরকার গঠন করলে হিন্দু সম্প্রদায় নিরাপদে বসবাস করতে পারবে।
বাংলাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপিত হচ্ছে: উৎসবমুখর পরিবেশে বাংলাদেশে উদযাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব। পূজার সার্বিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার শ্রী দিনেশ ত্রিবেদী। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর উত্তরায় সার্বজনীন পূজা কমিটির আয়োজনে শারদীয় দুর্গোৎসবের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান।
দিনেশ ত্রিবেদী বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসবের এমন আয়োজন বাংলাদেশে সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে। এবার বাংলাদেশে অত্যন্ত উৎসবমুখর, সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং নিরাপদ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। এর আগে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে যান ভারতীয় হাইকমিশনার। এ সময় তিনি মন্দির প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখেন এবং পূজার বিভিন্ন আয়োজন পর্যবেক্ষণ করেন। পরে স্ত্রীসহ আরতিতে অংশ নেন তিনি।
পূজায় সম্প্রীতির বার্তা দিলেন অভিনেত্রী মন্দিরা: শারদীয় দুর্গাপূজার আনন্দে মেতেছেন ঢালিউডের চিত্রনায়িকা মন্দিরা চক্রবর্তী। কখনো ঐতিহ্যবাহী গোলাপি কাতান শাড়ি ও সোনার গয়নায়, আবার কখনো লাল শাড়িতে ধরা দিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন সাজে। তবে শুধু রূপের ঝলক নয়, পূজার শুভেচ্ছাবার্তায় সবার জন্য ভালোবাসা, শান্তি ও সম্প্রীতির প্রত্যাশাও জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী। অষ্টমীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পূজার বেশ কয়েকটি ছবি প্রকাশ করেন মন্দিরা।
ছবিগুলোতে তাকে দেবী দুর্গার প্রতিমার সামনে হাস্যোজ্জ্বল ও ভক্তিভরা মুহূর্তে দেখা গেছে। একটি ছবিতে গোলাপি রঙের সোনালি পাড়ের ঐতিহ্যবাহী কাতান শাড়ি ও ভারী সোনার গয়নায় নজর কেড়েছেন তিনি। অন্যদিকে, লাল-কালো রঙের পোশাকে দেখা গেছে তার সাদামাটা অথচ আকর্ষণীয় সাজ। আলাদা একটি প্রোফাইল থেকেও লাল শাড়িতে পূজামণ্ডপে ঘোরাঘুরি ও পরিবারের সঙ্গে উৎসব উদ্যাপনের কিছু মুহূর্ত ভাগ করে নেন এই নায়িকা।
ছবিগুলোর সঙ্গে শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়ে মন্দিরা লেখেন, মায়ের চরণে জানাই শতকোটি প্রণাম। তার আশীর্বাদে পৃথিবী থেকে মুছে যাক সব অশুভ শক্তি, দূর হোক দুঃখ-কষ্ট, ঘুচে যাক সব অন্ধকার। বার্তায় তিনি আরও প্রত্যাশা করেন, প্রতিটি হৃদয় ভালোবাসা, শান্তি, সম্প্রীতি ও আনন্দে ভরে উঠুক। মা দুর্গা যেন সবার জীবনে সুস্বাস্থ্য, সমৃদ্ধি ও অফুরন্ত মঙ্গল বয়ে আনেন। শেষে ‘জয় মা দুর্গা’ বলে সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা জানান তিনি। মন্দিরার সাজের পাশাপাশি তার এই সম্প্রীতির বার্তাও ভক্তদের নজর কেড়েছে। উৎসবের আনন্দ সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক তার শুভেচ্ছাবার্তায় উঠে এসেছে সেই প্রত্যাশাই।
হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী, অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ ধর্মীয় আয়োজন সন্ধিপূজা। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট, অর্থাৎ মোট ৪৮ মিনিট ধরে চলে এ পূজা। এ সময় দেবী চামুণ্ডার আরাধনা করা হয়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানো এবং ১০৮টি পদ্মফুল নিবেদনের মধ্য দিয়ে সন্ধিপূজা সম্পন্ন করা হয়। মহানবমীতে যজ্ঞের ধোঁয়া, ঢাকের বাদ্যে সিদ্ধেশ্বরীতে দুর্গার আরাধনা পুরাণের বর্ণনায় দেবী দুর্গার অসুরবিনাশের কাহিনি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক।
চণ্ড, মুণ্ড ও রক্তবীজসহ অসুরদের বিনাশের মধ্য দিয়ে দেবী অশুভ শক্তির পরাজয় নিশ্চিত করেন বলে ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে। সেই বিশ্বাস ও ভক্তিকে ধারণ করেই মহানবমীতে দেবীর আরাধনায় মগ্ন থাকবেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। নবমীর পূজা-অর্চনা শেষে ভক্তদের মধ্যে ধীরে ধীরে বিদায়ের বিষাদ ছড়িয়ে পড়বে। আজ বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পূজা শেষে দেবী দুর্গা কৈলাসে ফিরে যাবেন। এরআগে গত শনিবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া পাঁচ দিনের শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটবে বিজয়া দশমীতে। আনন্দ, ভক্তি ও সম্প্রীতির আবহে উৎসব শেষ হলেও ভক্তদের মনে রয়ে যাবে দেবীর আগমন, আরাধনা ও বিদায়ের স্মৃতি।





