হানিট্র্যাপে ব্ল্যাকমেইল করে চাঁদাবাজির অভিযোগ
রাজধানীতে পাঁচ সদস্যের চক্র গ্রেপ্তার, মিলেছে একাধিক ভুক্তভোগীর আলামত
রাজধানীতে পরিকল্পিতভাবে ‘হানিট্র্যাপ’ পরিচালনা করে নিরীহ ব্যক্তিদের ফাঁদে ফেলে মারধর, আপত্তিকর ভিডিও ধারণ, ব্ল্যাকমেইল এবং চাঁদা আদায়ের অভিযোগে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তদন্তে জব্দ করা ডিজিটাল ডিভাইস থেকে একই কৌশলে একাধিক ব্যক্তিকে টার্গেট করার আলামত পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত সংঘবদ্ধ অপরাধের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত মিলেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক বিজ্ঞপ্তিতে সোমবার এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন— মো. আনোয়ার হোসেন (৪৫), বদিউজ্জামান শাহীন (৪৫), মরিয়ম (৪৯), শাহাদাত হোসেন (৫৮) ও উর্মী বেগম (৩৯)।
আরও পড়ুন: মোহাম্মদপুরে স্বেচ্ছাসেবক দলের খাল পরিষ্কার ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
পুলিশ জানায়, মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত রাজধানীর সবুজবাগ, বাড্ডা ও খিলগাঁও এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে তাদের কাছ থেকে ৯টি মোবাইল ফোন, একটি ওয়াকিটকি এবং নগদ চার হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।
মামলার এজাহার ও প্রাথমিক তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণকারী এক কর্মকর্তা গত ১৫ এপ্রিল ঋণসংক্রান্ত কাজে রাজধানীর রামপুরার দক্ষিণ বনশ্রীর একটি মার্কেটে যান। সেখানে এক নারী নিজেকে ঋণগ্রহীতা পরিচয়ে তার সঙ্গে পরিচিত হন এবং কৌশলে তার ভিজিটিং কার্ড সংগ্রহ করেন। পরে কয়েকদিন ধরে নিয়মিত মোবাইল ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে ওই কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়।
আরও পড়ুন: সাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে ঢাকায় থেমে থেমে ছন্দপতন বৃষ্টি
একপর্যায়ে ওই নারী বনশ্রী ইউনিটি হাসপাতালের সামনে দেখা করার প্রস্তাব দেন। নির্ধারিত স্থানে পৌঁছানোর পর আরেক নারী তাকে সেখান থেকে রিকশাযোগে বিভিন্ন গলি ঘুরিয়ে খিলগাঁও এলাকার একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, ফ্ল্যাটে প্রবেশের কিছুক্ষণ পর আরও কয়েকজন সেখানে উপস্থিত হয়ে ভুক্তভোগীর ওপর হামলা চালায়, মারধর করে এবং একজন নারীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় ভিডিও ধারণ করে।
এরপর অভিযুক্তরা ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, নগদ অর্থ, ব্যাংকের এটিএম কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র জোরপূর্বক নিয়ে যায়। একই সঙ্গে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, ভয়ভীতি ও ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে তার ব্যাংক হিসাব ও বিকাশ ব্যবহার করে মোট এক লাখ ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। পাশাপাশি ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাকে মানসিকভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়।
পরবর্তীতে ভুক্তভোগী গত ২২ জুন খিলগাঁও থানায় মামলা দায়ের করলে তদন্তে নামে ডিবি।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে জব্দ করা মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের প্রাথমিক ফরেনসিক বিশ্লেষণে একই ধরনের কৌশলে আরও একাধিক ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে নির্যাতন এবং আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণের আলামত পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই করে সম্ভাব্য অন্যান্য ভুক্তভোগী ও চক্রটির বিস্তৃত কার্যক্রম শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, হানিট্র্যাপের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক অর্থ আদায়, শারীরিক নির্যাতন এবং ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অপরাধ দণ্ডবিধি, চাঁদাবাজি-সংক্রান্ত আইন এবং ডিজিটাল অপরাধবিষয়ক প্রযোজ্য আইনের আওতায় গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে সামাজিক বা আর্থিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা, নির্জন স্থানে সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলা এবং ব্ল্যাকমেইল বা চাঁদাবাজির শিকার হলে বিলম্ব না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া জরুরি।





