সরকার-ইসির সমন্বয় ছাড়া তফসিল নয়

অক্টোবরকে সামনে রেখে প্রস্তুতি, আইনি কাঠামো ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার প্রশ্নে নতুন বার্তা

Sanchoy Biswas
এম এম লিংকন
প্রকাশিত: ৮:১৩ অপরাহ্ন, ০৬ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৯:১০ অপরাহ্ন, ০৬ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তুতি ও অবস্থান নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সরকারের সঙ্গে লিখিত ও অলিখিত সমন্বয় ছাড়া এখনই নির্বাচনের সময়সূচি বা তফসিল নিয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া সংগত হবে না। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন অক্টোবরকে সামনে রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে এবং সম্ভাব্য নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (আরএফইডি) আয়োজিত ফল উৎসব অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনারের এই মন্তব্য নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, সরকারের সঙ্গে সমন্বয় এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন বার্তা দিয়েছে।

আরও পড়ুন: নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব না দেওয়ায় এনসিপিসহ ৭ দলকে ইসির শোকজ

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, নির্বাচন কমিশন আগেও যেমন অক্টোবরকে সামনে রেখে কাজ করার কথা জানিয়েছিল, এখনও সেই প্রস্তুতিই অব্যাহত রয়েছে। তবে অক্টোবরকে সামনে রেখে প্রস্তুতি গ্রহণের অর্থ এই নয় যে নির্বাচন অবশ্যই ওই মাসেই অনুষ্ঠিত হবে। কারণ নির্বাচন আয়োজন একটি জটিল প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া, যেখানে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মাঠ প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনের সমন্বিত প্রস্তুতি অপরিহার্য।

তিনি বলেন, যদি অক্টোবরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রায় ৪৫ দিন আগে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হবে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই কমিশন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে আলোচনা এবং বাস্তব পরিস্থিতির মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আরও পড়ুন: দেশজুড়ে প্রার্থীরা মাঠে নেমেছেন, বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই

নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে এসেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গ। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান—সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং জেলা পরিষদের বহু পদ শূন্য বা মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসকের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কোনটি আগে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে বাস্তবতা এবং বিদ্যমান আইনি কাঠামো বিবেচনায় ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা পৌরসভা নির্বাচন আগে আয়োজন করা অধিক যৌক্তিক হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, সিটি কর্পোরেশনগুলো বর্তমানে প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় সেখানে নির্বাচন আয়োজনের সময় নির্ধারণেও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হবে।

নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, সব নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজন করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই জনগণের প্রয়োজন, প্রশাসনিক সক্ষমতা, আইনি প্রস্তুতি এবং সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের অন্যতম সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা। তবে বাস্তবে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে ভোটার তালিকা, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, প্রশাসনিক সহায়তা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা, নির্বাচনসামগ্রী সরবরাহ এবং মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতিসহ বহু বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের বক্তব্যে সেই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়।

তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে লিখিত এবং অলিখিত সমঝোতার ভিত্তিতেই নির্বাচন কমিশনকে কাজ করতে হয়। কারণ সীমানা পুনর্নির্ধারণ থেকে শুরু করে নির্বাচন-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমেই সম্পন্ন করতে হয়। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, কোন নির্বাচন জনগণের জন্য বেশি জরুরি এবং কোন পর্যায়ে নির্বাচন আগে আয়োজন করা প্রয়োজন—সে বিষয়েও সরকারের সঙ্গে আলোচনা হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন অপেক্ষমাণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে কোন নির্বাচন আগে হবে, তা নির্ধারণে জনগণের স্বার্থ, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং আইনি কাঠামো বিবেচনায় নেওয়া হবে। এসব বিষয়ে আলোচনা শেষে কমিশন পর্যায়ক্রমে তফসিল ঘোষণা করবে।

এদিকে একই অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশন ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করেছে। নির্বাচন আচরণবিধির খসড়া ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মহল থেকে প্রাপ্ত মতামত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালায় সমন্বয়ের উদ্যোগও নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের মতোই স্থানীয় সরকার নির্বাচনও স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এজন্য নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন, বিধিমালা, আচরণবিধি এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি সমন্বয়ের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে নির্বাচন আয়োজনের পরিবেশ তৈরি করা যায়।

তিনি আরও জানান, আগামী সপ্তাহ থেকে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত অগ্রগতি বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে গণমাধ্যমকে অবহিত করবেন। এর মাধ্যমে নির্বাচন প্রস্তুতি সম্পর্কে জনগণ ও অংশীজনদের নিয়মিত তথ্য জানানো হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনের এই বক্তব্যে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমত, কমিশন সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি জোরদার করছে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও কমিশন প্রশাসনিক ও আইনগত প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। তবে নির্বাচন আয়োজনের সময়, ধাপ এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ও অপরিহার্য। তবে এই সমন্বয় যেন কমিশনের নিরপেক্ষতা, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না করে—সেই বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ, তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমেদ এবং বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল বাছির। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির সভাপতি কাজী এমাদ উদ্দীন জেবেল, সহ-সভাপতি কাজী ফরিদ, সাধারণ সম্পাদক ইকরাম উদ দৌলা, যুগ্ম সম্পাদক এম এম লিংকনসহ সংগঠনের অন্যান্য সদস্য।