যে প্রেমের গল্প শেষ হয়েও শেষ হয়নি

কেন এতটা আপন হয়ে উঠেছিল ‘মনপুরা’?

Shahrier Islam Pallab
শাহরিয়ার ইসলাম পল্লব
প্রকাশিত: ৯:৩৬ অপরাহ্ন, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৯:৩৬ অপরাহ্ন, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

কিছু সিনেমা শুধু গল্প বলে না, দর্শককে একটি অনুভূতির ভেতর নিয়ে যায়। পর্দা নামার পরও সেই অনুভূতি থেকে যায় মনে। কোনো দৃশ্য, কোনো সংলাপ কিংবা হঠাৎ ভেসে আসা একটি গান ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই সিনেমার জগতে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এমনই এক অনুভূতির নাম ‘মনপুরা’। মুক্তির বহু বছর পরও যে সিনেমা দর্শকের মনে একইভাবে আলোড়ন তোলে, তার তালিকায় ‘মনপুরা’ নিঃসন্দেহে বিশেষ একটি নাম।

২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া গিয়াসউদ্দিন সেলিম পরিচালিত এই সিনেমা তখনকার প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হয়েছিল একেবারে ভিন্ন এক আবহে। গ্রামবাংলার প্রকৃতি, নদী, মানুষের সরল জীবন, প্রেম, সামাজিক বাস্তবতা আর বেদনার সমন্বয়ে তৈরি হয়েছিল ‘মনপুরা’র জগৎ। সেই জগতে প্রবেশ করার পর দর্শক শুধু একটি সিনেমা দেখেননি, বরং যেন কিছু সময়ের জন্য বসবাস করেছেন সোনাই ও পরীর সঙ্গে।

আরও পড়ুন: নতুন গান নিয়ে আশাবাদী ডলি সায়ন্তনী

গল্পের ভেতর সরল এক ভালোবাসা

‘মনপুরা’র গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে সোনাই ও পরী। সোনাই চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী এবং পরী চরিত্রে ফারহানা মিলি অভিনয় করেন। তাদের ভালোবাসার গল্পটি ছিল খুব সাধারণ মানুষের গল্প। এখানে ছিল না অতিরিক্ত চাকচিক্য, ছিল না অবাস্তব কোনো আয়োজন। বরং গ্রামের পরিচিত পরিবেশেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় দুজন মানুষের সম্পর্ক।

আরও পড়ুন: সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ‘ইনভেস্টমেন্ট’ নিয়ে যা জানালেন বর্ষা

কিন্তু সেই ভালোবাসার পথ কখনোই সহজ ছিল না। সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক সিদ্ধান্ত, ক্ষমতার প্রভাব এবং নানা প্রতিকূলতা তাদের সম্পর্ককে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। একসময় যে সম্পর্কের মধ্যে ছিল স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের আশা, সেটিই পরিণত হয় অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও বেদনার গল্পে। এই জায়গাতেই ‘মনপুরা’র গল্প অন্য অনেক প্রেমের গল্প থেকে আলাদা হয়ে যায়। সিনেমাটি দর্শককে শুধু প্রেমের আনন্দ দেখায়নি, ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসহায়ত্বও দেখিয়েছে।

পর্দায় উঠে এসেছিল বাংলার প্রকৃতি

‘মনপুরা’র আরেকটি বড় আকর্ষণ ছিল এর দৃশ্যায়ন। নদী, নৌকা, কাশবন, গ্রামের পথ, সবুজ প্রকৃতি-বাংলাদেশের গ্রামীণ সৌন্দর্যকে সিনেমাটির দৃশ্যপটে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দেওয়া হয়েছিল।

সিনেমার প্রকৃতি এখানে শুধু পটভূমি ছিল না। গল্পের আবেগের সঙ্গেও প্রকৃতি যেন এক ধরনের সম্পর্ক তৈরি করেছিল। নদীর বিশালতা যেমন চরিত্রদের অসহায়ত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে, তেমনি গ্রামের নির্জনতা অনেক দৃশ্যে তৈরি করেছে গভীর আবেগের আবহ। এ কারণে ‘মনপুরা’ দেখার সময় অনেক দর্শকের কাছে মনে হয়েছে, তারা কোনো সিনেমার সেট দেখছেন না; বরং বাংলাদেশের কোনো এক প্রত্যন্ত গ্রামের জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়েছেন।

সোনাই হয়ে চঞ্চল চৌধুরীর অন্যরকম পরিচয়

‘মনপুরা’র সোনাই চরিত্রটি চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র। চরিত্রটির মধ্যে ছিল সরলতা, আবেগ, ভালোবাসা ও অসহায়ত্ব। খুব বেশি নাটকীয়তা ছাড়াই একজন সাধারণ মানুষের অনুভূতিকে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন তিনি।

সোনাইয়ের হাসি যেমন দর্শককে আনন্দ দিয়েছে, তেমনি তার কষ্ট ও অপেক্ষা দর্শকের মনে তৈরি করেছে গভীর বেদনা। চরিত্রটির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার স্বাভাবিকতা। আর সেই স্বাভাবিকতাকেই বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয়।

পরী চরিত্রেও ফারহানা মিলি নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন। তার অভিনয়ে ছিল সরলতা ও আবেগ। সোনাই-পরীর সম্পর্ককে দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে দুজনের অভিনয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

সিনেমার প্রাণ হয়ে উঠেছিল গান

‘মনপুরা’র কথা উঠলে এর গান আলাদাভাবে মনে পড়ে। সিনেমার গানগুলো শুধু ছবির দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল না, বরং সিনেমার আবেগকে আরও গভীর করে তুলেছিল।

বিশেষ করে ‘নিথুয়া পাথারে’ গানটি শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। গানটির সুর ও কথায় যে বিষণ্নতা, অপেক্ষা ও আবেগ রয়েছে, তা সিনেমার গল্পের সঙ্গে মিশে এক অনন্য অনুভূতি তৈরি করেছে।

অন্যদিকে ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানটি সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। হারিয়ে যাওয়া সময়, সহজ-সরল জীবন ও পুরোনো দিনের স্মৃতিকে ধারণ করা গানটি এখনো শ্রোতাদের কাছে সমান পরিচিত।

‘মনপুরা’র গানগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল-এগুলো সিনেমা থেকে আলাদা করেও উপভোগ করা যায়। তাই সিনেমার জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে গানগুলোও নিজেদের আলাদা জীবন তৈরি করেছে।

কেন এতটা আপন হয়ে উঠেছিল ‘মনপুরা’?

‘মনপুরা’র সাফল্যের পেছনে একাধিক কারণ ছিল। প্রথমত, গল্পটি ছিল সহজ কিন্তু আবেগনির্ভর। দ্বিতীয়ত, নির্মাণে ছিল নিজস্বতা। তৃতীয়ত, অভিনয় ও সংগীত গল্পের সঙ্গে খুব স্বাভাবিকভাবে মিশে গিয়েছিল।

সবচেয়ে বড় বিষয়, সিনেমাটি দর্শকের আবেগকে গুরুত্ব দিয়েছিল। এখানে এমন কিছু অনুভূতি তুলে ধরা হয়েছে, যার সঙ্গে অনেক মানুষ নিজের জীবনের কোনো না কোনো স্মৃতি মিলিয়ে নিতে পারেন—ভালোবাসা, অপেক্ষা, হারিয়ে ফেলা, ফিরে পাওয়ার আশা কিংবা কোনো সম্পর্কের অসমাপ্তি। এই কারণেই ‘মনপুরা’ শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের দর্শকের সিনেমা হয়ে থাকেনি।

বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি তৈরি হয়েছিল সাংস্কৃতিক প্রভাব

মুক্তির পর ‘মনপুরা’ দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। সিনেমাটির গান, চরিত্র ও গল্প নিয়ে তৈরি হয় আলোচনা। পাশাপাশি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে গল্পনির্ভর ও নান্দনিক সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে ওঠে।

সিনেমাটি প্রমাণ করে, দর্শককে আকৃষ্ট করতে সবসময় বড় বাজেট, বিশাল সেট কিংবা অতিরিক্ত আয়োজন প্রয়োজন হয় না। শক্তিশালী গল্প এবং সেই গল্প বলার নিজস্ব ধরনও দর্শকের কাছে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট হতে পারে।

সময় পেরোলেও কেন পুরোনো হয়নি?

আজকের দর্শকের সিনেমা দেখার অভ্যাস বদলে গেছে। একসময় যে সিনেমা দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যেতে হতো, এখন সেটি মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের পর্দায় দেখা যায়। বিনোদনের মাধ্যমও বেড়েছে অনেক। তারপরও ‘মনপুরা’র আবেদন কমেনি। কারণ সময় বদলালেও মানুষের আবেগ বদলায়নি। ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা কিংবা প্রিয় মানুষকে হারানোর কষ্ট-এসব অনুভূতি আজও একই রকম। এ কারণেই নতুন প্রজন্মের দর্শকও ‘মনপুরা’র গান শুনলে কিংবা সিনেমাটি দেখলে তার গল্পের সঙ্গে সংযোগ খুঁজে পান।

একটি সিনেমার চেয়েও বেশি কিছু

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অনেক সিনেমা এসেছে, কিছু জনপ্রিয় হয়েছে, আবার সময়ের সঙ্গে হারিয়েও গেছে। কিন্তু কিছু সিনেমা মানুষের স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। ‘মনপুরা’ তেমনই একটি চলচ্চিত্র। সোনাই ও পরীর গল্প হয়তো পর্দায় একটি নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে থেমে গেছে। কিন্তু তাদের ভালোবাসা, অপেক্ষা ও বেদনা দর্শকের মনে এখনো নানা প্রশ্ন তৈরি করে। হয়তো এটাই সিনেমাটির সবচেয়ে বড় সাফল্য—গল্প শেষ হওয়ার পরও দর্শকের মনে গল্পটি চলতে থাকে।

‘মনপুরা’ তাই শুধু একটি প্রেমের সিনেমা নয়। এটি গ্রামবাংলার প্রকৃতির গল্প, মানুষের গল্প, ভালোবাসার গল্প এবং হারিয়ে যাওয়া কিছু অনুভূতির গল্প। বছর পেরিয়ে যায়, নতুন সিনেমা আসে, নতুন চরিত্র জনপ্রিয় হয়। কিন্তু কোনো এক বিকেলে নদীর পাড়ে বাতাস বইলে কিংবা হঠাৎ ‘নিথুয়া পাথারে’ গানটি কানে এলে মনে পড়ে যেতে পারে সেই সোনাই-পরীর কথা।

আর তখন বোঝা যায়-কিছু সিনেমা আসলে পুরোনো হয় না। তারা শুধু সময়ের সঙ্গে দর্শকের স্মৃতিতে আরও গভীরভাবে জায়গা করে নেয়। ‘মনপুরা’ তেমনই এক সিনেমা, যে প্রেমের গল্প পর্দায় শেষ হলেও দর্শকের মনে আজও শেষ হয়নি।