কলকাতায় কোরবানির ঈদের আগে গরু সরবরাহ সংকট, বাজারে পরিবর্তন
"কোরবানির ঈদের আগে এমন কখনো দেখিনি। অন্যান্য বছর এখানে দাঁড়ানোর জায়গা থাকত না," বলছিলেন কলকাতার ট্যাংরা অঞ্চলের বাসিন্দা মুহাম্মদ জাভেদ।
কলকাতা পৌরসভার অধীনে 'ট্যাংরা স্লটার হাউজ অ্যান্ড লাইভ স্টক' বা কসাইখানার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মঙ্গলবার কথাগুলো বলছিলেন তিনি।
আরও পড়ুন: পবিত্র আরাফায় হাজীদের জিয়া সাজারার শীতল ছায়া
গত ৩৫ বছর ধরে এই কসাইখানায় কাজ করছেন মি. জাভেদ। তার কথায়, "বকরি ঈদের আগে দূর দূর থেকে লোক আসত এখানে, খুব ভিড় হতো। এবার পরিস্থিতি খারাপ। আজ দেখে মনেই হচ্ছে না যে বকরি ঈদ আসছে।"
কোরবানির ঈদকে ভারতে বকরি ঈদও বলা হয়।
আরও পড়ুন: পবিত্র হজ আজ, তাঁবুর শহর মিনা থেকে আরাফাতে হাজিরা
একই সুর শোনা গেল কলকাতার খিদিরপুরের বাসিন্দা রিজওয়ানের গলাতেও। মঙ্গলবার ওই অঞ্চলেরই এক অস্থায়ী বাজারে এসেছিলেন তিনি, যেখানে এই সময় ছাগল, দুম্বা ইত্যাদি পশু বিক্রি হয়।
"অন্যান্য বার আমরা বড় গাড়ি ভাড়া করে কোরবানির জন্য গরু কিনতে যেতাম উত্তর ২৪ পরগণায় - কিন্তু এবার যাইনি। কাছাকাছি কোথাও গরু বিক্রি হচ্ছে না," বলছিলেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্প্রতি ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন কানুন কড়াভাবে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে।
ওই আইনে গরু, মহিষ, ষাঁড়, বলদ ইত্যাদি পশুর জবাইয়ের জন্য বয়স ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় শংসাপত্র বা সার্টিফিকেট, পৌরসভা বা প্রশাসন নির্ধারিত কসাইখানায় পশু কাটা এবং প্রকাশ্যে জবাই না করার মতো একাধিক বিষয়ে বিধিনিষেধের উল্লেখ করা আছে।
যদিও এখানে কোথাও জবাইয়ে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়নি, কিন্তু সব নিয়মকানুন মেনে কোরবানির ঈদে পশু জবাই করার কাজকে অবশ্যই কঠিন করে তুলেছে।
কোরবানির ঈদের আগে এই পদক্ষেপ পশু কেনা-বেচার উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন অনেকেই।
কোরবানির ঈদের আগে সরকারের তরফে ওই আইন কড়াভাবে মেনে চলা নিয়ে বিজ্ঞপ্তির পর এর বিরুদ্ধে হাই কোর্টে একাধিক মামলাও দায়ের করা হয়। তবে আদালতের তরফে সরকারি বিজ্ঞপ্তি বহাল রাখার কথাই জানানো হয়েছিল।
এদিকে, গরু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও কলকাতা ও তার লাগোয়া ইকবালপুর, খিদিরপুর, মোমিনপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় কোরবানির ঈদের আগে যে সমস্ত অস্থায়ী বাজারে ছাগল ও দুম্বার পাশাপাশি গরুও বিক্রি করা হতো, সেখানে গরু বিক্রি হচ্ছে না।
উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদসহ অন্যান্য জেলায় বিভিন্ন অংশে বেশিরভাগ বাজারে একেবারেই গরু বিক্রি হচ্ছে না, কোথাও হলেও তা খুবই কম।
কেন এই পরিস্থিতি- জানতে চাইলে মহম্মদ ফারুক নামে ট্যাংরার এক বাসিন্দা বিবিসিকে বলছিলেন, "কোরবানি দিতে মানা করেনি, কিন্তু সাপ্লাই কম। তাছাড়া লোকে রিস্কও নিতে চাইছে না। তাই গরু বিক্রি হচ্ছে না।"
'পরিস্থিতি খুব খারাপ'
ট্যাংরার কসাইখানা লাগোয়া যে অংশে জবাই করার আগে পশু রাখা হয়, সেখানে স্থায়ী চালা করে দেওয়া আছে। মঙ্গলবার সেখানে কর্মীরা উপস্থিত হলেও কোনো গরু ছিল না।
এখানে দারোয়ানের কাজ করেন সুভাষ জানা। তিনি বলেছেন, "আমি ১৬ বছর এখানে কাজ করছি। প্রতি বছর এখানে খুব ভিড় হয়। এবারে খাঁ খাঁ করছে।"
ওই শেডের দিকে ইঙ্গিত করে সেখানকার আরেক কর্মী শেখ জাহিদ বলেন, "এখানে ৩০-৪০টা গরু বাঁধা থাকত, এখন আপনি দেখতেই পাচ্ছেন কিছু নেই। পরিস্থিতি খুব খারাপ। তবে আমরা তো ব্যবসা করি না। এখানে স্লটার হাউজে জবাই হয়… আমরা কাজ করি। সমস্যায় পড়েছে যারা ব্যবসা করে তারা আর গরিব লোকগুলো। তাদের মধ্যে হিন্দু মুসলমান দুই-ই আছে।"
আগেও জবাইখানায় পশু চিকিৎসক থাকতেন জানিয়ে মি. জাহিদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "এখানে পশু চিকিৎসক আছে, তারা সার্টিফিকেট দিলে তবেই জবাই হতো। কিন্তু এ বছর ১৪ বছরের বেশি বয়সের গরু পাওয়া মুশকিল।"
"জবাইয়ের জন্য গরু আসছে না," বলেও তিনি জানান।
প্রসঙ্গত, সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, ১৯৫০ এর ওই আইন অনুযায়ী পৌরসভার চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং একজন সরকারি পশুচিকিৎসক যৌথভাবে ষাঁড়, বলদ, গরু ইত্যাদির জবাই সংক্রান্ত শংসাপত্র প্রদান করতে পারবেন।
পশুর বয়স ১৪ বছরের বেশি বা তারা শ্রম করতে অক্ষম, আঘাত পেয়েছে, বিকৃতি রয়েছে বা রোগের কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছে, তা হলে তারা জবাইয়ের জন্য উপযুক্ত হতে পারে।
ট্যাংরার ওই কসাইখানাতে কসাইয়ের কাজ করেন এমডি জাভেদ। তার কথায়, "কাজ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। আসলে সাপ্লাই কম, তাই কাজ স্লো। প্রায় দু'মাস ধরেই এটা হচ্ছে।"
কেন জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলেন, "সাপ্লাইয়ের বেশিরভাগই উত্তর প্রদেশ বা অন্যান্য রাজ্য থেকে আসে। কিন্তু আজকাল পথে খুব ঝামেলা হচ্ছে। গাড়ি আটকে দিচ্ছে। তাই সাপ্লাই কম। রাস্তায় এত ঝামেলা হচ্ছে যে অনেকে গরু আনা কমিয়ে দিয়েছেন।"
পশ্চিমবঙ্গে এর আগে এই জাতীয় অভিজ্ঞতা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, "না এখনো পর্যন্ত হয়নি, কিন্তু কেউ রিস্ক নিতে চাইছে না।"
চলতি বছরে ঈদ উদযাপনে কোনো প্রভাব পড়েছে কি না জিজ্ঞাসা করায় সেখানকার আরেক কর্মী শেখ রাজু জানিয়েছেন, এবার খাসি কোরবানি দেবেন তিনি। তার কথায়, "অন্যান্য বছর গরু কোরবানি দিই, এবারে খাসি (কোরবানি) দেব। বাকি সব কিছু অন্যান্য বছরের মতোই, প্রবলেম নেই।"
শেখ জাহিদ আবার কিছুটা রসিকতার সুরে বলেছেন, "একদিক থেকে ভালোই হয়েছে, গরু হলে এক লাখ টাকা বা তার বেশি লাগত, খাসির দাম কুড়ি হাজার।"
ছাগলের দাম বেড়েছে
কোরবানির ঈদের আগে বাজারে ছাগলের চাহিদা বেড়েছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দামও।
কলকাতার নারকেলডাঙার 'বকরি মার্কেটে' দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন গোলাম সারওয়ার। তিনি বলেছেন, "এবছর গরুর বদলে ছাগল, খাসি, দুম্বার চাহিদা বেশি। তাই দাম বেড়ে গেছে। অন্যান্য বছরের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।"
তবে দুম্বার দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতারা ছাগল কিনতে আগ্রহী বলেই জানিয়েছেন তিনি।
উত্তর প্রদেশ থেকে ওই বাজারেই বিক্রির উদ্দেশ্যে ৫৪টা ছাগল এনেছেন নিলু সিং।
তিনি বলেছেন, "আমি ছেলেবেলা থেকে প্রতি বছর বাবার সঙ্গে আসতাম। এবছর বকরির দাম বেশি পাচ্ছি। রাস্তায় কড়াকড়ি হলেও গাড়িতে বকরি দেখলে কিছু বলে না। একবার তল্লাশি করে ছেড়ে দেয়।"
এই বাজারের একেবারে শেষ প্রান্তে অন্যান্য বছর কোরবানির ঈদের আগে গরু বিক্রি হতো বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মোহম্মদ তসলিম নামে এক যুবকের কথায়, "ছোট-খাটো ব্যবসায়ীরা এখানে অন্যান্য বছর গরু বিক্রি করত, কিন্তু এবছর কেউ আসেনি।"
'এখানে খুব বড় বাজার বসত'
কলকাতা সংলগ্ন খিদিরপুর, মোমিনপুর, ইকবালপুরের মতো একাধিক মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলের যে সমস্ত বাজারে গরু বিক্রি হতো সেখানে এবছর অন্য ছবি ধরা পড়েছে।
খিদিরপুরের বাসিন্দা আব্দুল সায়েদ বলেন, "আমরা এই বছর ছাগল কোরবানি দেব ঠিক করেছি। সিপিএম, তৃণমূলের সময় অন্য নিয়ম ছিল - এখন অন্য নিয়ম। তখন নিয়ম মেনে কোরবানি হতো, এবারেও সরকার যা বলবে তাই হবে। আমাদের কোরবানি দেওয়া নিয়ে কথা, সেটা যারই হোক।"
খিদিরপুরে ছাগল, দুম্বা বিক্রির একাধিক অস্থায়ী বাজার বসেছে।
সেখানকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হিন্দু বাসিন্দা বিবিসিকে বলেছেন, "ইকবালপুর, মোমিনপুরের মতো জায়গায় গরু বিক্রির অস্থায়ী বাজার বসত। এবারে বসেনি। আসলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করেছে বিক্রি করতে গিয়ে যদি সমস্যায় পড়ে। আবার ক্রেতারা ভেবেছে কেনার পর যদি কোরবানি না দিতে পারে তাহলে কী হবে।"
এই অঞ্চলের 'সৈয়দ বাবা মাজার ও মসজিদ'- এর পাশেই এক সময় বড় বাজার বসত। সেখানে গরুও বিক্রি হতো। গত তিন বছর ধরে ওই বাজার বন্ধ আছে।
এর গেটের বাইরেই ঝালমুড়ি, ভেলপুরি ইত্যাদি বিক্রি করেন সাধু প্রসাদ নামে এক ব্যক্তি। তার কথায়, "এখানে আগে বিশাল বড় বাজার বসত। দূর থেকে লোকে বড় বড় গাড়ি নিয়ে আসত। কিন্তু তিন বছর আগে থেকে এটা বন্ধ আছে, কারণ জমি নিয়ে কিছু সমস্যা ছিল। জায়গাটা ঘিরে দিয়েছে। সেই সময় বকরি ঈদের আগে বাজারে লোক এলে আমারও বিক্রি বাড়ত।"
অন্যান্য জেলার পরিস্থিতি
রাজ্য সরকারের তরফে ওই আইন বলবৎ করার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় পশুর হাটে প্রভাব পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা এবং ওমরপুরে পশু বাজার বসে, কোরবানির ঈদের আগে সেখানে বিপুল সংখ্যক গরু বিক্রি হতো। কিন্তু এবারে অন্য ছবি ধরা পড়েছে।
সেখানকার একজন হিন্দু ব্যবসায়ী বলেছেন, "এবারে অবস্থা একেবারে ভালো না। এই সময় গরু বিক্রি করে দেনা মেটাব ভেবেছিলাম।"
দক্ষিণ ২৪ পরগণার ভাঙড়-সহ বিভিন্ন অঞ্চলে অন্যান্য বছর পশু বাজারে গরু কেনাকে কেন্দ্র করে তীব্র ব্যস্ততা থাকে, কিন্তু চলতি বছরে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। চিন্তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বীরভূম জেলার রামপুরহাটের বাসিন্দা আব্দুল করিম জানিয়েছেন 'ঝামেলা' এড়াতে এই বছর তারা ছাগল কোরবানি দেবেন।
'পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা সেকুলার'
ওই আইন বলবৎ হওয়ার পরপরই কলকাতার নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহম্মদ শফিক কাসমি গরু কোরবানি না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বিজেপি সরকার পুরোনো আইন কার্যকর করছে উল্লেখ করে ভারতের সংবাদ মাধ্যম এএনআইকে তিনি বলেন, "বড় আকারের পশুর জবাইয়ের আগে সার্টিফিকেট জোগাড় করতে হবে, আর কসাইখানায় জবাই করতে হবে। এই নিয়ম ছিল। সেগুলোই কার্যকর করা হচ্ছে। তবে এই পশুদের সার্টিফিকেট দেওয়ার দায়িত্ব তো সরকারের। তাদের উচিত ছিল আগে সমস্ত ব্যবস্থা করে তারপর এই আইন বলবৎ করা।"
পাশাপাশি তিনি বলেছিলেন, "আমি রাজ্যের সব মুসলিমদের কাছে আবেদন করব, আপনারা গরু খাবেন না, গরু জবাই করবেন না। তবে এতে লোকসান হিন্দু ভাইদের। কারণ গরু তো বিক্রি করে হিন্দুরা।"
"আমি তো মুসলিমদের বলব, গরু খাবেন না। বরং ছাগল কিনুন। মুসলিমরা ছাগল পালন করে। ছাগল কিনলে মুসলিমদের লাভ হবে।"
নাখোদা মসজিদের আরেক ইমাম মোহম্মদ নূর আলম জানিয়েছেন, গরু জবাই না করার সিদ্ধান্তই মেনে চলছেন তারা।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "আমরা নিয়ম মেনে চলব সে কথা আগেই জানানো হয়েছে। সেটাই পালন হচ্ছে।"
সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের ফলে উদ্যাপনের মেজাজে প্রভাব পড়বে কি না, সে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, "নিয়ম মেনে চলতে তো কোনো অসুবিধা নেই। আর পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের চিন্তাধারা সেকুলার। এই একটা কারণে উদযাপনে বা মানুষের চিন্তায় কোনো প্রভাব পড়বে বলে আমার মনে হয় না।"
পেশাদার, ভারসাম্যপূর্ণ ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল উপযোগী করে লেখাটি পুনরায় লিখে দিন এবং মেটা টাইটেল,কীওয়ার্ড,ডেসক্রিপশন, হ্যাস ট্যাগ





