ভোটেকোশি নদীর বন্যায় নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধ

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১০:১১ পূর্বাহ্ন, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

নেপালে বর্ষাকাল সাধারণত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে অনুকূল সময়। এ সময়ে ভারী বৃষ্টিতে নদীগুলো পানিতে পরিপূর্ণ থাকায় নদীভিত্তিক জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়ে। দেশের চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ভারত ও বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশে রপ্তানি করে নেপাল। তবে এবার সেই নদীগুলোই বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট।

আরও পড়ুন: ইরানকে সমর্থন পুতিনের, পশ্চিমাদের দিলেন কড়া বার্তা

গত ২৬ আগস্ট ভোটেকোশি নদী ব্যবস্থায় ভয়াবহ বন্যার পর একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও রপ্তানি উভয়ই কমে গেছে। বিশেষ করে সম্প্রতি ভারতীয় গ্রিডের মাধ্যমে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া শুরু করা বাংলাদেশে সরবরাহ কার্যত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

বর্ষা মৌসুমে নেপাল গড়ে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করত। বন্যার পর তা কমে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।

আরও পড়ুন: ইরানের পাল্টা হামলায় বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে: আইআরজিসি

দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ আমদানিনির্ভর থাকার পর এখন আঞ্চলিক বিদ্যুৎ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে নেপাল। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে দেশটিকে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে হয়। এর মধ্যেই ভুটেকোশির বন্যা দেশটির রপ্তানি পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমোদন পাওয়া দুটি প্রকল্প—২২ দশমিক ১ মেগাওয়াটের চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ২৪ মেগাওয়াটের ত্রিশূলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প—বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে দুটি প্রকল্পেরই বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

চিলিমে থেকে ২১ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং ত্রিশূলি থেকে ১৮ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভারতে বিক্রির অনুমোদন ছিল। একই সঙ্গে ভারত হয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠানোরও অনুমতি পেয়েছিল প্রকল্প দুটি। বাংলাদেশে বিক্রি করা বিদ্যুতের মূল্য নেপাল মার্কিন ডলারে পেয়ে থাকে।

নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দির্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠা বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী দুটি প্রকল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিকল্প হিসেবে অন্য কোনো প্রকল্পের বিদ্যুৎ বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য ভারতকে অনুমতি দিতে বলা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি কার্যত শূন্যে নেমে এসেছে বলেও জানান তিনি।

বন্যার ক্ষয়ক্ষতি শুধু এই দুই প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নেই। বন্যার পর মোট ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।

সানজেন, আপার সানজেন ও সালাসুঙ্গি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এগুলোকে ‘আইসোলেটেড মোডে’ পরিচালনা করছে নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি। অর্থাৎ জাতীয় গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এসব কেন্দ্র শুধু আশপাশের এলাকার চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

তবে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি কমে যাওয়ার একমাত্র কারণ বন্যা নয়। সাধারণত এই সময়ে ভারতে সর্বোচ্চ পরিমাণ বিদ্যুৎ পাঠানোর কথা থাকলেও তিনটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে মোট ৭৩ দশমিক ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে পারছে না নেপাল। কারণ, এসব প্রকল্পের রপ্তানি অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও ভারত এখনো তা নবায়ন করেনি।

৩৮ দশমিক ৮ মেগাওয়াটের আপার চামেলিয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের রপ্তানি অনুমোদনের মেয়াদ ৩১ জুন শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ২৪ দশমিক ২৫ মেগাওয়াটের সেটি রিভার এবং ১০ দশমিক ৭০ মেগাওয়াটের আপার তাদি খোলা প্রকল্পের অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ৩১ জুলাই।

নতুন করে অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত এই তিন প্রকল্পের সম্মিলিত ৭৩ দশমিক ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভারতকে বিক্রি করতে পারবে না নেপাল। দেশটির প্রতিটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের রপ্তানি অনুমোদন প্রতিবছর নবায়ন করতে হয়।

বিদ্যুৎ আমদানি ও রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ার দায়িত্ব ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির। কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ বিদেশে বিক্রি করতে হলে নেপালকে এই সংস্থার অনুমোদন নিতে বা তা নবায়ন করতে হয়।

এ পরিস্থিতি আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে নেপালের সামনে থাকা নানা সীমাবদ্ধতাকেও স্পষ্ট করেছে।

এখন পর্যন্ত ৩৭টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে মোট প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে নেপাল। চিলিমে ও ত্রিশূলিও এই তালিকায় রয়েছে।

ভারতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রির ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ান এনার্জি এক্সচেঞ্জের ডে-অ্যাহেড ও রিয়েল-টাইম বাজার ব্যবহার করে নেপাল। পাশাপাশি হরিয়ানা ও বিহারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মধ্যমেয়াদি বিদ্যুৎ বিক্রয় চুক্তিও রয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ আদান-প্রদানে ৪০০ কেভি ঢালকেবার-মুজাফফরপুর লাইন এবং ১৩২ কেভি তানাকপুর-মহেন্দ্রনগর, কাটাইয়া-কুশাহা, রাক্সৌল-পারওয়ানিপুর, গান্ডাক-রামনগর ও মাইনাহিয়া-সম্পাতিয়া সঞ্চালন লাইনসহ একাধিক সংযোগ ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশের বাজারে বিদ্যুৎ রপ্তানির বিষয়টি আরও কিছু জটিলতা তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ঢাকায় নেপাল ও বাংলাদেশের জ্বালানি সচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে বিদ্যমান ৪০ মেগাওয়াটের ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে রপ্তানির বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছিল।

এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু পরে ভারত জানায়, সঞ্চালন সক্ষমতার ঘাটতির কারণে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে পাঠানো সম্ভব হবে না।

চলতি বছরের জুনে নেপাল-ভারত জ্বালানি সচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকেও অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ার জন্য ভারতকে অনুরোধ করে নেপাল।

এ ছাড়া ৪৫৬ মেগাওয়াটের আপার তামাকোশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ আরও কয়েকটি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন চেয়েছে নেপাল। তবে যেসব প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগ, চীনা ঠিকাদার বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে চীনা সরঞ্জাম ব্যবহৃত হয়েছে, সেসব প্রকল্পের বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন দিতে ভারত অনাগ্রহ দেখাচ্ছে।

আপার তামাকোশি এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রকল্পটির হাইড্রোমেকানিক্যাল, ইলেকট্রোমেকানিক্যাল ও সঞ্চালন লাইনের কাজের চুক্তি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পেলেও সিভিল নির্মাণকাজ করেছে একটি চীনা প্রতিষ্ঠান। এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন দেয়নি ভারত।

দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন জ্বালানি বৈঠকে বিষয়টি বারবার ভারতের কাছে তুলে ধরেছে নেপাল।

আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হয় এমন তৃতীয় দেশের বিনিয়োগে পরিচালিত প্রকল্পের ক্ষেত্রে, যখন ওই দেশটির সঙ্গে ভারতের স্থলসীমান্ত রয়েছে কিন্তু বিদ্যুৎ খাতে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা চুক্তি নেই। তবে নেপালের কর্মকর্তা ও জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনা বিনিয়োগ না থাকলেও চীনা ঠিকাদার বা সরঞ্জাম ব্যবহার করা প্রকল্পগুলোর বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদনের ক্ষেত্রেও ভারত অনীহা দেখাচ্ছে।

তাদের মতে, বিদ্যুৎ রপ্তানি বাড়াতে হলে এ বিষয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে আরও সক্রিয় আলোচনা প্রয়োজন।

নেপালের সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী কুলমান ঘিসিং বলেন, বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন নেওয়া বা নবায়নের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করতে হয়। কখনো সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে, কখনো নির্বাহী পরিচালকের সঙ্গে আবার পরিস্থিতি অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের মাধ্যমেও আলোচনা করতে হয়। বিদ্যুৎ বাণিজ্যের অনুমোদন নিশ্চিত ও নবায়নের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ঘিসিং জানান, ভারতের কাছে প্রতি ইউনিট ৫ দশমিক ৪৫ ভারতীয় রুপিতে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রির বিষয়ে তিনি চুক্তি করেছিলেন। তবে এরপর আর সেই রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে পারেনি নেপাল।

২০২১ সালে বিদ্যুৎ রপ্তানি শুরু করে নেপাল। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত ও বাংলাদেশে মোট ২৯ দশমিক ৩২ বিলিয়ন নেপালি রুপির বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছে নেপাল। একই সময়ে শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে ১০ দশমিক ২৩ বিলিয়ন রুপির বিদ্যুৎ আমদানি করেছে দেশটি। এতে বিদ্যুৎ বাণিজ্যে নেপালের নিট উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ০৯ বিলিয়ন রুপি।

নেপালের এই বিদ্যুৎ বাণিজ্য মূলত মৌসুমি নদীর পানিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। বর্ষায় নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকায় জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বেড়ে যায় এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ রপ্তানি করা সম্ভব হয়। আর শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে গেলে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেশি থাকায় ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে হয়।

ভোটেকোশির বন্যা ঠিক সেই সময়েই নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা দিয়েছে, যখন দেশটির রপ্তানি আয় সর্বোচ্চ হওয়ার কথা।

বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে কাজ করছে নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি। একই সঙ্গে সচল অন্যান্য প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ সরিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য ভারতের অনুমোদন পাওয়ারও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।