নতুন পে-স্কেলের গেজেটে বিলম্ব, সেপ্টেম্বরে প্রকাশের সম্ভাবনা; বকেয়াসহ বেতন পাওয়ার আশা

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৮:১৪ অপরাহ্ন, ০৫ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৯:৫৯ অপরাহ্ন, ০৫ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নতুন বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) সংক্রান্ত গেজেট চলতি জুলাই মাসে প্রকাশ হচ্ছে না। প্রশাসনিক প্রস্তুতি, ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থার কারিগরি সমন্বয় এবং আর্থিক প্রভাব মূল্যায়নের কারণে গেজেট প্রকাশে সময় লাগছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের আশা, আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শেষ সপ্তাহের মধ্যে গেজেট জারি হতে পারে। যদিও কার্যকর হওয়ার তারিখ ১ জুলাই থেকেই গণ্য করার বিষয়ে নীতিগত আলোচনা চলছে। ফলে গেজেট জারি হলে সরকারি চাকরিজীবীরা বকেয়াসহ বর্ধিত বেতনের সুবিধা পেতে পারেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে আর্থিক সক্ষমতা, সরকারি ব্যয়ের প্রভাব, ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায়। সে কারণেই গেজেট প্রকাশে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।

আরও পড়ুন: বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হলেও নতুন বেতন কাঠামোর কার্যকারিতা ১ জুলাই থেকে গণ্য করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে গেজেট জারির পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ধিত বেতনের পাশাপাশি বকেয়া অর্থও একসঙ্গে পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

এদিকে গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং অবসরের অপেক্ষায় থাকা কর্মচারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নতুন বেতনের হার কত হবে, কোন ধাপে বাস্তবায়ন হবে, ভাতা কীভাবে যুক্ত হবে এবং অবসরজনিত আর্থিক সুবিধা কীভাবে নির্ধারিত হবে—এসব বিষয় নিয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা প্রকাশ হয়নি।

আরও পড়ুন: ক্যান্সার আক্রান্ত ক্রিকেটার মেহেদী হাসান হৃদয়ের চিকিৎসায় ৫ লাখ টাকা সহায়তা

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সময় অধিকাংশ প্রক্রিয়া হাতে সম্পন্ন করা সম্ভব হলেও বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, গ্র্যাচুইটি, জিপিএফ এবং অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রম ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ও আইবাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে ধাপে ধাপে মূল বেতন কার্যকর করতে হলে সফটওয়্যারে বড় ধরনের পরিবর্তন এবং নতুন প্রযুক্তিগত সমন্বয় প্রয়োজন হবে।

এ বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, একাধিক ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা হলে একই কর্মচারীর জন্য বারবার পে-ফিক্সেশন করতে হবে। এতে প্রশাসনিক জটিলতার পাশাপাশি সফটওয়্যারভিত্তিক ত্রুটির ঝুঁকিও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পদোন্নতি, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড, পেনশন এবং অন্যান্য অবসরজনিত সুবিধা নির্ধারণেও জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী আগামী কয়েক মাসের মধ্যে অবসরে যাচ্ছেন। কারণ, তাঁদের পেনশন, গ্র্যাচুইটি, অর্জিত ছুটির নগদায়নসহ অধিকাংশ আর্থিক সুবিধা শেষ প্রাপ্ত মূল বেতনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে কিংবা ধাপে ধাপে কার্যকর করা হলে তাঁদের আর্থিক প্রাপ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এ প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী নেতারা প্রথম ধাপেই শতভাগ মূল বেতন কার্যকর করে পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের মতে, পরে পর্যায়ক্রমে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা সমন্বয় করা হলে সফটওয়্যারের ওপর চাপ কমবে এবং অবসরপ্রাপ্ত বা অবসরের দ্বারপ্রান্তে থাকা কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বৈষম্যের আশঙ্কাও কমে আসবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, উচ্চপর্যায়ের একটি সচিব কমিটি বর্তমানে নতুন পে-স্কেলের আর্থিক প্রভাব, সফটওয়্যার প্রস্তুতি এবং প্রশাসনিক বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে বাস্তবায়নের সময় কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা আর্থিক জটিলতা সৃষ্টি না হয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ সময়োপযোগী। তবে বেতন বৃদ্ধি যেন মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁদের মতে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি দ্রুত সম্পন্ন করে সরকার নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশ করবে। এতে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যেও বিদ্যমান অনিশ্চয়তা অনেকটাই দূর হবে।