সেপ্টেম্বরে তফসিল, নভেম্বরের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন: সিইসি

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৬:৪৩ অপরাহ্ন, ২৭ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৭:৫৩ অপরাহ্ন, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সবকিছু অনুকূলে থাকলে নভেম্বরের শেষ দিকে ভোটগ্রহণ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তবে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা, দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে  এ কথা বলেন তিনি।  

আরও পড়ুন: এভিয়েশন নিরাপত্তায় দক্ষতা বাড়াতে শাহজালালে ডিএফটি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আচরণবিধি সংশোধনসহ যেসব বিষয় আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল, সেগুলোর বেশির ভাগই ফিরে এসেছে। এখন প্রয়োজনীয় ম্যানুয়াল তৈরির কাজ শেষ করা হবে। ফলে কমিশন তফসিল ঘোষণা করলেই নির্বাচনী কার্যক্রমে নেমে পড়তে পারবে।

সিইসি বলেন, “আমার মনে হয়, আমরা সেপ্টেম্বরের মধ্যে একটা শিডিউল দিতে পারব।” তবে তফসিল সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে ঘোষণা করা হলেও ভোটগ্রহণের সময় আগামী বছরের দিকে চলে যেতে পারে—এমন পরিস্থিতি এড়াতেই সেপ্টেম্বরের মধ্যে তফসিল দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: নেপালের বন্যায় এখনো কোনো বাংলাদেশির হতাহতের খবর মেলেনি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

তিনি বলেন, বছরের মধ্যে নির্বাচন শুরু করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশেষ করে একটি উপনির্বাচন ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিষয়ও রয়েছে। এসব আইনি সময়সীমা বিবেচনায় নিয়ে কমিশনকে সময়সূচি নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

নভেম্বরের মধ্যে পরীক্ষা শেষ করার অনুরোধ: 

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক ইউনিয়ন পরিষদকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার সময়সূচি নির্বাচনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, সে বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করবে কমিশন।

সিইসি বলেন, পরীক্ষা কিছুটা এগিয়ে এনে নভেম্বরের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হলে নভেম্বরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করা যেতে পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হবে।

তিনি বলেন, শীতকাল নির্বাচনের জন্য তুলনামূলকভাবে অনুকূল হলেও এ সময় স্কুলের পরীক্ষা থাকে। আবার ফেব্রুয়ারি থেকে রমজান শুরু হওয়ায় পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের জন্য সময় আরও সংকুচিত হয়ে আসবে। এরপর ঈদুল আজহা, গরম ও বর্ষাকালসহ নানা বিষয় সামনে আসবে। তাই কমিশনের হাতে নির্বাচনের জন্য কার্যকর সময় খুবই সীমিত।

দুর্গাপূজাও বিবেচনায়: 

সিইসি জানান, দুর্গাপূজার সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক পূজামণ্ডপ থাকে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেসব ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত থাকেন। ফলে পূজার আগে-পরে একটি সময় নির্বাচন আয়োজন থেকে বিরত থাকতে হবে।

তিনি বলেন, নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো কমিশনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেই। এসব ‘এক্সোজেনাস ভেরিয়েবল’ বিবেচনায় নিয়েই নির্বাচন আয়োজনের সময় নির্ধারণ করতে হবে।

৩৭১ ইউনিয়ন পরিষদ অগ্রাধিকার: 

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে আইনগতভাবে যেসব নির্বাচন আগে করার প্রয়োজন, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সিইসি।

তিনি বলেন, ২০২১ সালের ১০ জুন প্রথম ধাপে ৩৭১টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আইনগত প্রয়োজন অনুযায়ী এসব নির্বাচনসহ যেসব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আগে করার সময় হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে।

তবে পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার নির্বাচন নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা থাকবে বলেও জানান তিনি। এসব এলাকায় খারাপ মৌসুমে নির্বাচন না করে শুষ্ক মৌসুমে ভোটগ্রহণের চেষ্টা করা হবে।

নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ: 

সিইসি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্বাচনী সামগ্রী ও প্রকিউরমেন্টের ক্ষেত্রে কমিশনের কোনো ঘাটতি নেই। নির্বাচনের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যালট ছাপানোসহ অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ফজল সাহেবকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় শুরু করতে বলা হয়েছে বলে জানান তিনি। শিগগিরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সভা শুরু হবে।

উপনির্বাচনেও প্রস্তুত কমিশন: 

একটি আসনের উপনির্বাচনের প্রস্তুতিও কমিশন নিচ্ছে বলে জানান সিইসি। ওই নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় পোস্টাল ব্যালটের কার্যক্রমে অভিজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

দেশের অভ্যন্তরের পাশাপাশি দেশের বাইরে থাকা ভোটারদের জন্যও পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা কার্যকর করার বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করতে বলা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ: 

এর আগে নতুন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সৌজন্য সাক্ষাতের বিষয়েও সাংবাদিকদের জানান সিইসি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষাৎ করা হয়নি। বৃহস্পতিবার কমিশনের চার সদস্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন; একজন কমিশনার দেশের বাইরে থাকায় তিনি যেতে পারেননি।

প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ মিনিটের ওই সাক্ষাতে রাষ্ট্রপতিকে কমিশনের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানানো হয়। জবাবে রাষ্ট্রপতি জাতীয় নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্যভাবে আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে অভিনন্দন জানান।

সিইসি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনও জাতীয় নির্বাচনের মতো পেশাদার, বিশ্বাসযোগ্য, নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে কমিশন রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা চেয়েছে। রাষ্ট্রপতি কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

সিইসি জানান, রাষ্ট্রপতি কোনো নির্দেশনা দেননি; বরং নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি ও কবে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, তা জানতে চেয়েছেন। কমিশন যাতে স্বাধীনভাবে, পেশাদারিত্বের সঙ্গে ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, সে ক্ষেত্রে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

‘ভোটার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাই’: 

সিইসি বলেন, নির্বাচন কমিশনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ভোটারদের অধিকার ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা। জাতীয় নির্বাচনে যে মানদণ্ড বজায় রাখা হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অন্তত সেই মান বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

“আমরা ভোটার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাই। এটার জন্য যা যা করা দরকার, তা করব”—বলেন সিইসি।

তিনি আরও বলেন, কমিশন পেশাদারিত্ব, স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে চায়।

এনআইডি জালিয়াতি ঠেকাতে নজরদারি: 

সম্প্রতি মৃত ব্যক্তির এনআইডি সংশোধনের আবেদন করার অভিযোগ প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, বিষয়টি তিনি সংবাদপত্রে দেখেছেন এবং নির্বাচন কমিশন ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে।

তিনি বলেন, এনআইডি-সংক্রান্ত জালিয়াতি রোধে কমিশনের প্রচেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই। এ ধরনের অনিয়ম শুধু নির্বাচন কমিশনের একার বিষয় নয়; দেশের বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসব জালিয়াতি প্রতিরোধ করতে হবে।

আইন সংশোধন না হলেও বিদ্যমান আইনে নির্বাচন

স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত আইন সংশোধনের প্রস্তাব ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানান সিইসি। আচরণবিধির সংশোধনের প্রস্তাবগুলোর অধিকাংশই ফিরে এসেছে এবং এর মধ্যে বেশ কিছু বিষয় কেবল কারিগরি বা ভাষাগত সংশোধনের পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারসংক্রান্ত আইন সংশোধনের বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিসভা ও পরবর্তী আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেটি এগোতে হবে। তবে আইন সংশোধন না হলেও বিদ্যমান আইনের ভিত্তিতে নির্বাচন আয়োজন করা হবে।

সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করে নভেম্বরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর সম্ভাবনার কথাই জানিয়েছেন সিইসি। তবে পরীক্ষার সময়সূচি, দুর্গাপূজা, আইনগত সময়সীমা এবং অন্যান্য বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত ভোটের তারিখ নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন।