সড়ক পরিবহনে নৈরাজ্য ও মাফিয়াচক্রের দৌরাত্ম্য দমনে তৎপর সরকার
- যানজট কমাতে ছয় মাসের মধ্যে বাস রুট রেশনালাইজেশন
- ঢাকায় প্রতি রুটে চলবে নির্দিষ্ট এক কোম্পানির বাস
- কাউন্টারভিত্তিক যাত্রীসেবা, ই-টিকেটিং ও জিপিএস ট্র্যাকিং থাকবে
- ঢাকাকে ৩২টি রুটে বিভক্ত ও চালকদের মাসিক বেতনের ভিত্তিতে নিয়োগ
একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো তার উন্নত ও সুশৃঙ্খল যোগাযোগ ব্যবস্থা। অথচ বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাতটি দীর্ঘদিন ধরে এক শ্রেণির সিন্ডিকেট, অবৈধ চাঁদাবাজ এবং পরিবহন মাফিয়াদের পকেটস্থ জিম্মি দশায় পরিণত হয়েছে। রুট পারমিট নিয়ে জালিয়াতি, যত্রতত্র চাঁদা আদায়, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দাপট এবং চালকদের বেপরোয়া প্রতিযোগিতায় দেশের সড়কগুলো আজ মৃত্যুফাঁদে রূপ নিয়েছে। পরিবহন খাতে নৈরাজ্য নতুন কিছু নয়। পরিবহন মালিক এবং শ্রমিকরা যাত্রীদের জিম্মি করে রীতিমতো জোরপূর্বক সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া নেন। এ নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে যাত্রীদের বাদানুবাদ, হাতাহাতি এমনকি মারামারির ঘটনাও ঘটছে হরহামেশা। এ ছাড়া ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বচসা তো আছেই। রাজধানীসহ সারা দেশে যানজটের অন্যতম একটি কারণ গণপরিবহন শ্রমিকদের স্বেচ্ছাচারিতা। তারা তাদের খেয়ালখুশিমতো এমনভাবে ক্রসিংয়ে বা মোড়ে বা রাস্তার মাঝখানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো করে, যাতে করে পেছনের কোনো যানবাহন তাকে অতিক্রম করতে না পারে। ফলে সবুজ সিগন্যাল থাকা সত্ত্বেও যানবাহনগুলোকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সাধারণ যাত্রীদের জানমালের নিরাপত্তা এবং পরিবহন শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই মাফিয়া চক্র পুরো খাতে এক চরম নৈরাজ্যের রাজত্ব কায়েম করেছে। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিতে এবং দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সড়ক পরিবহনে এই অপশক্তির দৌরাত্ম্য কঠোর হস্তে দমন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনার মাধ্যমে যানজট কমাতে ছয় মাসের মধ্যে বাস রুট রেশনালাইজেশন বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ পদ্ধতিতে একটি রুটে একাধিক নয়; মাত্র একটি কোম্পানির ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস চলবে। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে ঢাকা মহানগরের গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, আগামী দুই মাসে বাস স্টপেজ নির্ধারণ, লক্কড়ঝক্কড় বাস মেরামত এবং চালকদের মাসিক বেতনের ভিত্তিতে নিয়োগ করা হবে। এই সময়ে কয়েকটি রুট চালু করা হবে। এরই মধ্যে ঢাকাকে ৩২টি রুটে বিভক্ত করে সবকটিতে ছয় মাসের মধ্যে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস চালু করা হবে। এ পদ্ধতিতে কাউন্টারভিত্তিক যাত্রীসেবা, ই-টিকেটিং ও জিপিএস ট্র্যাকিং থাকবে। সড়কে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সদ্য গঠিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নতুন কমিটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ‘নতুন এ কমিটির মাধ্যমে সড়ক পরিবহনে দীর্ঘদিনের নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও মাফিয়াবৃত্তির অবসান ঘটবে।’গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে ফেডারেশনের নবনির্বাচিত নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন ও ফাতেহা পাঠ শেষে তিনি এ কথা বলেন। রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতির পটভূমি থেকে আসা এসব নেতা তাদের নতুন চিন্তা ও ধারণা প্রয়োগ করে সড়ক পরিবহন খাতের অচলাবস্থা নিরসন, পরিবহন খাতকে আইনসংগত করা এবং যাত্রীসেবায় দৃষ্টান্তমূলক অবদান রাখতে সক্ষম হবেন।’ তিনি বলেন, ‘নবনির্বাচিত এ কমিটির নেতৃত্বে সড়ক পরিবহন খাতের যে দুরবস্থা ও বেহাল দশা তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে দেশের মানুষকে একটি নতুন ব্যবস্থাপনা দেয়া সম্ভব হবে। এতে মানুষের আস্থা বাড়বে, তারা নিরাপত্তা বোধ করবে এবং যাতায়াতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বস্তি আসবে।
আরও পড়ুন: সৌদি আরবে বেসামরিক অবকাঠামোয় হুতি হামলার নিন্দা বাংলাদেশের
রাজধানীর মিরপুরের পাঁচটি লেগুনা স্ট্যান্ড জোরপূর্বক দখল, গাড়িপ্রতি ৩০০ টাকা চাঁদা দাবি ও মালিকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। চাঁদাবাজি বন্ধ করা ও হামলার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং স্ট্যান্ডগুলো দখলমুক্ত করার দাবি জানানো হয়। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি, ডিএমপি কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন বৃহত্তর মিরপুর লেগুনা মালিক-শ্রমিক ইউনিয়ন। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) দ্বিতীয় তলার সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন সংগঠনের নেতারা। লিখিত বক্তব্যে মো. ইয়াকুব আলী বলেন, গত ৫ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অস্ত্র প্রদর্শন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে মিরপুর ১ নম্বর সেকশনের পাঁচটি লেগুনা স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় ঢাকা-১৪ আসনের বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এএস এ সিদ্দিক সাজু সমর্থক ও সহযোগী হিসেবে পরিচিত এবং অপকর্মের দায়ে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত বিপ্লব, সোলেমান দেওয়ান, মহব্বত আলী, পাভেল ভূঁইয়া, তৈয়ব আলী, আলমগীর হোসেন, শামীম ও মজিবর রহমানসহ ৬০ থেকে ৭০ জন জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়।
সংগঠনের নেতাদের দাবি, লেগুনার মালিকদের কাছ থেকে প্রতিটি গাড়ির জন্য ৩০০ টাকা চাঁদা চাওয়া হচ্ছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভয়-ভীতি দেখানো ও চাপ সৃষ্টি করা হয়। এ ছাড়া লেগুনার মালিক ইয়াকুব আলী, নজরুল ইসলাম ও বাবুলের ওপর হামলার অভিযোগ করেন তারা। ইয়াকুব আলীর শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং তার চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র ও মেডিকেল রিপোর্ট সংগঠনের কাছে আছে বলে জানানো হয়। বক্তারা অভিযোগ করেন, হামলার ঘটনার পর ইয়াকুব আলী দারুস সালাম থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে তার অভিযোগ গ্রহণ করা হয়নি। এ বিষয়ে তদন্ত এবং কোনো পুলিশ সদস্যের গাফিলতি প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা। সংবাদ সম্মেলনে পাঁচটি স্ট্যান্ড দখলের অভিযোগ তদন্ত, ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই, হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধ এবং স্ট্যান্ডগুলো দখলমুক্ত করার দাবি জানানো হয়। রাজনৈতিক পরিচয় যেন তদন্তে প্রভাব না ফেলে, সে আহ্বানও জানান বক্তারা। তাদের দাবি, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ রয়েছে।
আরও পড়ুন: মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরকারের জনকল্যাণমুখী স্বাস্থ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক: প্রধানমন্ত্রী
বেপরোয়া বাস চালানো ও রেষারেষি বন্ধে সরকার ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ বা বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ চালু করার উদ্যোগ নেয় সাত বছরের বেশি সময় আগে। এই ব্যবস্থায় হাজার হাজার মালিক থাকবেন না। ঢাকায় পাঁচটি কোম্পানির অধীন বাস চলবে। একাধিকবার চালুর উদ্যোগ নিয়েও এই কার্যক্রম সফলতার মুখ দেখেনি। এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশ রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনার মাধ্যমে যানজট কমাতে ছয় মাসের মধ্যে বাস রুট রেশনালাইজেশন বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ পদ্ধতিতে একটি রুটে একাধিক নয়; মাত্র একটি কোম্পানির ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস চলবে।
গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে ঢাকা মহানগরের গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, আগামী দুই মাসে বাস স্টপেজ নির্ধারণ, লক্কড়ঝক্কড় বাস মেরামত এবং চালকদের মাসিক বেতনের ভিত্তিতে নিয়োগ করা হবে। এতো দিন পরিবহনমালিকদের বাধা ও আপত্তির মুখে বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি আলোচনাও মুখ থুবড়ে পড়েছিল।
শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মুখে সরকার ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন আইন পাস করেছিল। মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপে এটি কার্যকর করতে এক বছরের বেশি সময় লেগে যায়। আইনটি সংশোধনের দাবিতে পরিবহনমালিক-শ্রমিকেরা ধর্মঘট করে সারা দেশ কার্যত অচল করে দেন।
পরিবহনমালিক-শ্রমিকদের চাপের মুখে ২০১৯ সালের শেষ দিকে আইন সংশোধন করে প্রায় প্রতিটি ধারা শিথিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সড়ক আইনে ৪২টি ধারায় অপরাধ এবং কঠোর শাস্তির কথা উল্লেখ আছে। পরিবহনমালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ৩৪টি ধারা সংশোধনের প্রস্তাব আসে। আইনে যতগুলো ধারা সংশোধনের মাধ্যমে শিথিল করার সুপারিশ করা হয়েছে, তার প্রায় সব কটিই পরিবহনচালক, মালিক ও কর্তৃপক্ষের শাস্তিসংক্রান্ত।
২০২৪ সালের ১৩ মার্চ মন্ত্রিসভায় ‘সড়ক পরিবহন (সংশোধন) আইন ২০২৪’-এর খসড়া অনুমোদন করা হয়। বিদ্যমান আইনের অন্তত ১২টি ধারায় পরিবর্তন আনা হয়। সড়ক পরিবহন আইনটি মালিক বা শ্রমিকের বিরুদ্ধে ছিল না; দুর্ঘটনা রোধই ছিল এর উদ্দেশ্য; কিন্তু পরিবহনমালিক ও শ্রমিকেরা এটিকে দেখছেন তাঁদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে। এখনো তাঁরা এই আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছেন।
বিগত সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নানা সময়ে সড়ক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে দিকনির্দেশনা দেওয়া হতো। দিকনির্দেশনা মানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে কাজ শুরু করতে বলতেন। ফলে এত বছর যে কর্তৃপক্ষগুলো কাজ করেনি, সেটির দায়মুক্তি দেওয়া হতো। এত দিন না করায় তাদের কোনো জবাবদিহি করতে হতো না। এত দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ থাকার পরেও এত দিন সড়ক নিরাপদ কেন হয়নি, জবাবদিহি হিসেবে সেটি কেউ জিজ্ঞেস করে না। জবাবদিহি না থাকার সংস্কৃতির কারণে এসব দিকনির্দেশনার অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি।
সড়কে দীর্ঘদিনের নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা দমনে বর্তমান সরকারের সাম্প্রতিক কঠোর ও সমন্বিত উদ্যোগগুলো সত্যিই প্রশংসা ও সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। বছরের পর বছর ধরে ঢাকার গণপরিবহন খাতে যে বিশৃঙ্খলা ভর করেছিল, তা দূর করতে প্রশাসনের এই জোরালো অবস্থান সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।





