এবারের স্লোগান ‘চলে একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’

আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা ‘জনতার ইশতেহার’ ঘোষণা জামায়াতের

Sanchoy Biswas
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত: ৬:০৪ অপরাহ্ন, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৭:৩২ অপরাহ্ন, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

কর্মসংস্থান, নারী নিরাপত্তা ও দুর্নীতিরোধে গুরুত্ব দিয়ে বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে ১০০ দিনের অ্যাকশন প্ল্যান, বছর ও ৫ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মমুখী করা, সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত ও বেকারত্ব সমাধানে সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকবে। ইশতেহারে রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও। দলীয়ভাবে এই ইশতেহারের নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত হোটেল শেরাটনে বুধবার সন্ধ্যায় এই ইশতেহার প্রকাশ করা হবে। সেদিন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকবেন।

গতকাল সোমবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। জামায়াতের ইশতেহারের স্লোগান হচ্ছে ‘চলে একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’।

আরও পড়ুন: আইডি হ্যাক হয়নি, নিজেদের রক্ষায় তারা মিথ্যা বলছে: তারেক রহমান

তিনি জানান, ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে বিদেশি প্রতিনিধিসহ বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি ও কূটনীতিক, রাজনৈতিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সামনে রেখেই এবারের ইশতেহার সাজানো হয়েছে, যেখানে ‘জনতার ইশতেহার’ নামে অ্যাপভিত্তিক প্রচারণাও চালানো হয়েছিল। সেখানে আসা ৩৭ লাখের বেশি পরামর্শের প্রতিফলন থাকবে ইশতেহারে।

ইশতেহার প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা জানিয়েছেন, তাঁরা দেশের সামগ্রিক বিষয় মাথায় রেখেই তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করছেন। একই সঙ্গে এসব কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তারও রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে। সুন্দরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সরকার গঠনের পর প্রথম ১০০ দিনে কী করা হবে তা-ও উল্লেখ থাকবে ইশতেহারে। এ ছাড়া বছরওয়ারি এবং পাঁচ বছরে কী কী করা হবে তারও উল্লেখ থাকবে ইশতেহারে। মোট ৪১টি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এর উপবিষয়ও থাকবে। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক এবং বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে ইশতেহারের পরিকল্পনাগুলো সাজানো হয়েছে। এজন্য কাজ করছেন দেশে এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষিত বিষয়ভিত্তিক ৩০ জন বিশেষজ্ঞ, যারা ইতোমধ্যেই ইশতেহারের খসড়া তৈরি করে দলটির কাছে জমা দিয়েছেন। দলটির নীতিনির্ধারণী সভায় এটি পাস হলে চূড়ান্ত রূপ পাবে এবং জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হবে।

আরও পড়ুন: দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপির ২৮ নেতা বহিষ্কার

কর্মসংস্থান, নারী নিরাপত্তা ও দুর্নীতিরোধে গুরুত্ব

তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় ও বাস্তবভিত্তিক খাতগুলো ধরে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে। এজন্য দেশে ও বিদেশে থাকা ৩০ জন বিশেষজ্ঞকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা ইতোমধ্যে খসড়া তৈরি করে আমাদের দিয়েছেন। এতে ৪১টি বিষয়কে প্রাধান্য এবং এর উপবিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে নারীর নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতির উন্নয়ন, দুর্নীতিকে লাল কার্ড দেখানোসহ ৪১টি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’

ইশতেহারে যা থাকছে : নারীর নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন : নারীকে ছাড়া টেকসই সমৃদ্ধি সম্ভব নয় বলে মনে করে জামায়াত। দলটি ক্ষমতায় এলে নারীরা দেশে সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করবে বলে মনে করেন দলটির নেতারা। তারা বলছেন, বর্তমানে জামায়াতের যারা রাজনীতি করছেন, তাদের অর্ধেকই নারী এবং শিক্ষিত। জামায়াতের মহিলা শাখা রয়েছে। ছাত্রীদেরও একটি সংগঠন রয়েছে, যেখানে মেয়েরা নেতৃত্ব দিচ্ছে। তা ছাড়া জামায়াতের নারী নেত্রীরা বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। রয়েছেন চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার। ফলে জামায়াত কখনো নারীদের উন্নয়নে বাধা নয়, বরং সহায়ক হবে বলে মনে করেন দলটির নেতারা। এজন্য নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মান, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইশতেহারে উল্লেখ থাকবে। এ ছাড়া কর্মজীবী মায়েদের জন্য কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার বিষয়ে ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান।

টেকসই অর্থনীতি : দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় জামায়াত। বিশেষ করে ব্যাংকের সুষ্ঠু পরিচালনা, অর্থ পাচার এবং ঘুষ-দুর্নীতি রোধ, রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি, জাকাতভিত্তিক অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিতে চায় দলটি। এ ছাড়া স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালু করা হবে; যাতে এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা একই সঙ্গে থাকবে। তিন বছরে শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ বাড়ানো হবে না। বন্ধ কলকারখানা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে চালু করা হবে, যেখানে শ্রমিকদের ১০ শতাংশ মালিকানা থাকবে। লাইসেন্স ব্যবস্থা সহজ করা হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণসুবিধা থাকবে।

দুর্নীতি দমন : জামায়াতের ইশতেহারের অন্যতম দিক থাকবে দুর্নীতি দমন। দলটি মনে করে দুর্নীতির কারণে দেশ পিছিয়ে পড়ছে। দেশের সম্পদের কোনো অভাব নেই, কিন্তু তার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। দুর্নীতির কারণে অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, তা দেশে থাকলে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, কমে যাবে মূল্যস্ফীতি। এ ছাড়া দুর্নীতি না থাকলে দেশের সর্বত্র সুশাসন কায়েম হবে। এতে দেশের মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবে।

শিক্ষাসংক্রান্ত : দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যুগোপযোগী ও আধুনিক করতে চায় জামায়াত। উন্নত জ্ঞানবিজ্ঞানের সমন্বয়ের সঙ্গে কর্মমুখী শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে চায় দলটি। দেশে যাতে কোনো শিক্ষিত বেকার তৈরি না হয়, সেজন্য নেওয়া হবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি গড়ে তোলা, দেশে উন্নত গবেষণাগার তৈরি, জনগণকে ইসলামি ও বিজ্ঞানমনস্ক করার নানা পরিকল্পনা থাকবে। এ ছাড়া স্নাতক শেষে ৫ লাখ ডিগ্রিধারীকে দুই বছর মেয়াদে মাসে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হবে। মেধার ভিত্তিতে ১ লাখ শিক্ষার্থীকে মাসে ১০ হাজার টাকা করে শিক্ষাঋণ দেওয়া হবে। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার জন্য প্রতি বছর ১০০ শিক্ষার্থী সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ পাবেন।

জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা : স্বাস্থ্যসেবায় পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সি জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। ৬৪ জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল করা হবে। গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর বয়স দুই বছর পর্যন্ত মা ও সন্তানের প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

১ কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক কর্মসংস্থান : কর্মসংস্থান ও তারুণ্যের পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিয়ে পাঁচ বছরে ১ কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রতিটি উপজেলায় ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ এবং প্রতিটি জেলায় ‘জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন করে পাঁচ বছরে ৫০ লাখ চাকরি নিশ্চিত করা হবে। নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে ৫ লাখ উদ্যোক্তা, ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হবে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাত : তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রূপরেখায় ভিশন-২০৪০ ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত। ২০৩০ সালের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তিতে ২০ লাখ চাকরি তৈরি, ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন, আইসিটিতে রপ্তানি ৫ বিলিয়নে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে ইশতেহারে।