২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২

ভাষা আন্দোলনের নীরব প্রস্তুতি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির ঐতিহাসিক দিন

Any Akter
আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: ১২:৫০ অপরাহ্ন, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৩:৪৬ অপরাহ্ন, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এক ধরনের চাপা উত্তেজনার ভেতর। প্রকাশ্যে তখনো বড় কোনো কর্মসূচি নেই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিকে কেন্দ্র করে ছাত্রসমাজ নতুন করে সংগঠিত হওয়ার পথে হাঁটছিল। সেই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২।

এই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অনানুষ্ঠানিকভাবে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। প্রকাশ্য সভা, মিছিল কিংবা ঘোষিত কর্মসূচির বাইরে থেকে ছাত্রনেতারা বৈঠক, আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে বৃহত্তর আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণে মনোযোগ দেন। পরিস্থিতির বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তারা সচেতনভাবেই নীরব সংগঠনের পথ বেছে নেন।

আরও পড়ুন: বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা

ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আগের অভিজ্ঞতা। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা এবং ১৯৫০ সালের বিভিন্ন প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতা নতুন করে পর্যালোচনা করা হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ছাত্রনেতারা উপলব্ধি করেন, বিচ্ছিন্ন ও স্বল্পপরিসরের আন্দোলনে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত, ধারাবাহিক ও ব্যাপক আন্দোলন।

এই উপলব্ধি থেকেই আন্দোলনের ধরন, বিস্তার এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে গভীর আলোচনা হয়। সরকারের দমননীতি, নজরদারি এবং আগের আন্দোলনে ছাত্রনেতাদের গ্রেপ্তারের ঘটনা আলোচনায় গুরুত্ব পায়। ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নির্ধারণে এই বাস্তবতা মাথায় রাখার বিষয়ে একমত হন আলোচনায় অংশ নেওয়া ছাত্রনেতারা।

আরও পড়ুন: সাক্ষী বিড়ম্বনায় পুলিশ

২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকায় ছাত্রদের মধ্যে ঘন ঘন মতবিনিময় লক্ষ্য করা যায়। কোনো আনুষ্ঠানিক সভা না থাকলেও ছোট ছোট গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে আলোচনা চলতে থাকে। আইন অনুষদ, কলাভবন ও কার্জন হল এলাকাকে কেন্দ্র করে এসব তৎপরতা ছিল তুলনামূলক বেশি। এসব আলোচনা ছিল পরিকল্পনাভিত্তিক এবং সতর্ক, যাতে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়ানো যায়।

আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে- রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক রাখলে তা টেকসই হবে না।

ছাত্রনেতারা মনে করেন, শহরের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছাড়া আন্দোলনকে সফল পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সে লক্ষ্যেই ভবিষ্যতে কীভাবে যোগাযোগ বিস্তৃত করা যায়, তা নিয়ে প্রাথমিক চিন্তাভাবনা শুরু হয়।

একাধিক ছাত্রনেতা এই মত দেন যে, সরকার যে কোনো সময় নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে বা দমনমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে। তাই প্রকাশ্য কর্মসূচির আগে জনমত গঠনের কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা প্রশ্নে সমাজের বিভিন্ন স্তরে সমর্থন তৈরি না হলে আন্দোলন চাপের মুখে পড়ে যেতে পারে- এই উপলব্ধিই আলোচনায় বারবার উঠে আসে।

তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রকাশ্যে আন্দোলনে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় ছাত্ররা সচেতন কৌশল অবলম্বন করেন। অনানুষ্ঠানিক বৈঠক, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং সীমিত পরিসরের আলোচনা ছিল এই দিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এসব নীরব উদ্যোগ ভবিষ্যৎ আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

ইতিহাসবিদদের মতে, ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ কোনো তাৎক্ষণিক ঘটনার দিন না হলেও এটি ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতিপর্বে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এই দিনের আলোচনাগুলো আন্দোলনের দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করতে সহায়তা করে এবং পরবর্তী কর্মসূচির জন্য মানসিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করে।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রসমাজের এই নীরব ও সচেতন প্রস্তুতিই ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগে আন্দোলনকে নতুন গতি দেয়। প্রকাশ্যের আন্দোলনের পেছনে যে সুপরিকল্পিত চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও কৌশল কাজ করেছিল- ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে আছে ইতিহাসে।