নদী, বিল আর ইতিহাসের মোহনায় মুন্সীগঞ্জ

প্রকৃতির ক্যানভাসে গড়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম পর্যটন নগরী

Sadek Ali
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৮:১৭ পূর্বাহ্ন, ০৭ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৯:৫৬ পূর্বাহ্ন, ০৭ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী ও ইছামতির জলধারা বয়ে চলেছে যে জনপদের বুক চিরে, সেই মুন্সীগঞ্জ যেন প্রকৃতি ও ইতিহাসের এক অনন্য মিলনভূমি। সবুজে ঘেরা বিস্তীর্ণ বিল, নদীবেষ্টিত জনপদ, হাজার বছরের প্রত্নঐতিহ্য এবং কীর্তিমানদের স্মৃতিধন্য এই জেলা পর্যটনের এক অপার সম্ভাবনার নাম। রাজধানী ঢাকা থেকে অল্প সময়ের পথ পেরোলেই চোখে পড়ে নদী, প্রকৃতি, পুরাকীর্তি ও সংস্কৃতির এক মনোমুগ্ধকর জগৎ। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও যথাযথ পরিচর্যা পেলে মুন্সীগঞ্জ দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন নগরীতে পরিণত হতে পারে।

বাংলার ইতিহাস ও সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মুন্সীগঞ্জের প্রতিটি জনপদে ছড়িয়ে রয়েছে অতীতের অসংখ্য স্মৃতি। একদিকে নদী ও প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, অন্যদিকে প্রাচীন স্থাপত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সমাহার—দুইয়ের মেলবন্ধনে জেলাটি পর্যটকদের কাছে হয়ে উঠতে পারে এক অনন্য গন্তব্য।

আরও পড়ুন: পুলিশ কমিশনার ফয়েজুল কবিরের নেতৃত্বে আরএমপির ইতিহাসে সর্বোচ্চ মাদক উদ্ধার

মুন্সীগঞ্জের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাল, সেন, সুলতানি ও মোগল আমলের নানা অধ্যায়। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে এখনও দাঁড়িয়ে আছে সেই সময়ের স্থাপত্য নিদর্শন, যা অতীতের সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। মোগল আমলের ঐতিহাসিক ইদ্রাকপুর কেল্লা আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। বাংলার সুবেদার ও সেনাপতি মীর জুমলার সময়ে নির্মিত এই দুর্গ একসময় নদীপথ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।

সদর উপজেলার রামপালে রয়েছে রাজা বল্লাল সেনের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ এবং বিশাল দিঘি। ইতিহাসের নানা ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে আছে এসব স্থাপনা। একই এলাকায় অবস্থিত বাবা আদম মসজিদ মুসলিম স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। কিংবদন্তি ও ইতিহাসের মিশেলে স্থানটি এখনও দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।

আরও পড়ুন: সীমান্তে পুশইন ঠেকাতে বিজিবির সচেতনামূলক মাইকিং

মুন্সীগঞ্জের বজ্রযোগিনী শুধু একটি গ্রাম নয়, এটি বিশ্ববিখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করের স্মৃতিধন্য ভূমি। তার স্মৃতি বহনকারী পণ্ডিত ভিটা আজও ইতিহাসপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। একইভাবে টঙ্গিবাড়ীর সোনারং জোড়া মঠ, নাটেশ্বর বৌদ্ধ মন্দির এবং শ্রীনগরের শ্যামসিদ্ধির মঠ প্রাচীন স্থাপত্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য উদাহরণ।

জেলার অন্যতম বড় আকর্ষণ আড়িয়ল বিল। বর্ষা মৌসুমে এই বিস্তীর্ণ জলাভূমি যেন প্রকৃতির এক বিশাল আয়নায় পরিণত হয়। যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর সবুজের মিতালি। ভোরের কুয়াশা, বিকেলের সোনালি আলো আর নৌকার মৃদু দোলায় আড়িয়ল বিল হয়ে ওঠে প্রকৃতিপ্রেমীদের স্বপ্নের ঠিকানা। প্রতিবছর বর্ষাকালে শত শত ভ্রমণপিপাসু মানুষ এই বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন।

পদ্মা সেতু চালুর পর মুন্সীগঞ্জের পর্যটন সম্ভাবনা আরও বেড়েছে। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সুবাদে রাজধানী থেকে খুব সহজেই জেলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে পৌঁছানো যায়। একদিনেই পর্যটকরা জেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল ঘুরে দেখতে পারেন এবং পাশাপাশি উপভোগ করতে পারেন পদ্মার বিস্তৃত জলরাশি ও মাওয়া এলাকার মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ।

পর্যটনের পাশাপাশি মুন্সীগঞ্জের রয়েছে নিজস্ব খাদ্য ঐতিহ্যও। জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া যায় ঐতিহ্যবাহী সাগর কলা, পাতক্ষীর, রসগোল্লা এবং সুস্বাদু মিষ্টান্ন। ফলে ইতিহাস, প্রকৃতি ও খাদ্য সংস্কৃতির সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ রয়েছে এখানে।

তবে এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জেলার অধিকাংশ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা এখনও পর্যাপ্ত পরিচর্যা ও প্রচারের অভাবে পর্যটকদের কাছে সেভাবে পরিচিত হয়ে উঠতে পারেনি। অনেক দর্শনীয় স্থানে নেই পর্যাপ্ত তথ্যফলক, বিশ্রামাগার কিংবা পর্যটকবান্ধব অবকাঠামো। ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের একটি বড় অংশ এসব স্থানের অবস্থান কিংবা ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত নন।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, জেলার প্রায় ৫০টিরও বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক ও দর্শনীয় স্থানকে কেন্দ্র করে সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে মুন্সীগঞ্জ শুধু একটি জেলা নয়, দেশের অন্যতম পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে আড়িয়ল বিল, মাওয়া-পদ্মা সেতু এলাকা এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে একসঙ্গে যুক্ত করে পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলা সম্ভব।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মুন্সীগঞ্জকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে একটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব ইতোমধ্যে সরকারের পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। (সূত্র: বাসস)

নদীমাতৃক বাংলাদেশের হৃদয়ে অবস্থিত মুন্সীগঞ্জ প্রকৃতির এক উন্মুক্ত ক্যানভাস। ইতিহাসের গর্ব, নদীর সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ বিল, প্রাচীন স্থাপত্য এবং সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য মিলিয়ে এই জনপদ যেন এক অনাবিষ্কৃত পর্যটন ভাণ্ডার। যথাযথ পরিকল্পনা ও পরিচর্যা পেলে খুব শিগগিরই মুন্সীগঞ্জ দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন নগরী হিসেবে নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।