জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈমকে চট্টগ্রাম পুলিশের ‘শারীরিক নির্যাতন’
ক্রিকেটার নাঈমকে নির্যাতনের ঘটনায় প্রতিবাদ-নিন্দার ঝড়
জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে চট্টগ্রামে পুলিশ দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভ, উদ্বেগ ও নিন্দার ঝড় বইছে। প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছেন ক্রিকেটভক্তরা। উদ্বেগ প্রকাশ করে তদন্তের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। বসে নেই বাংলাদেশ ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনও (কোয়াব)। এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে সংগঠনটি।
এর আগে শুক্রবার গভীর রাত থেকে সামাজিক মাধ্যমে নাঈমকে হেনস্তার বেশ কয়েকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেগুলোর একটিতে নাঈম পুলিশের অন্যায় আচরণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করেন।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামের রাউজানে গুলিতে যুবদল নেতা নিহত, এলাকায় উত্তেজনা
ক্রিকেটার নাঈমকে পুলিশি নির্যাতনের ঘটনায় যা বললেন তার বাবা
জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনার নাঈম হাসানকে জিম্মি করে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের খুলশী থানা পুলিশের বিরুদ্ধে। বিষয়টি স্বীকার করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার আমিরুল ইসলাম।
আরও পড়ুন: উলিপুরে উলিপুর রিপোর্টার্স ইউনিটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির নেতা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর, নাঈমের বাবা মাহবুব আলম বলেন, “গত রাতে আমার ছেলেকে পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে আমি দ্রুত থানায় যাই। ডিউটি অফিসার আমাকে প্রথমে থানায় ঢুকতেই দেননি; দূরে গিয়ে বসতে বলেন। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে থানায় প্রবেশের সুযোগ পাই। জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় পাওয়ার পরও আমার ছেলেকে ন্যাক্কারজনকভাবে মারধর করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। থানায় এসে পরিচয় দেওয়ার পরও ওসি আরিফ হোসেন আমার ছেলেকে অপমানজনক কথা বলেছেন। পরে ঢাকা থেকে বিসিবি চেয়ারম্যান তামিম ইকবাল এবং পরিচালক ইসরাফিল খসরু সাহেবের ফোন পাওয়ার পর পুলিশ নমনীয় হয় এবং ভুল স্বীকার করে।”
এ ঘটনায় তিনি জড়িত পুলিশ সদস্যদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন নাঈম হাসান ও তার পরিবারের সদস্যরা।
নিন্দা জানিয়ে বিবৃতিতে কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন বলেন, দেশের যেকোনো নাগরিকের জন্য এমন ঘটনা অগ্রহণযোগ্য। খেলোয়াড়ের প্রতি এমন অগ্রহণযোগ্য এবং অনুচিত আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বোর্ড। এই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে তারা।
নাঈমকে ‘মারধরের’ ঘটনায় বিসিবির গভীর উদ্বেগ
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনার নাঈম হাসানকে চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন সদস্যের দ্বারা হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিসিবি জানায়, শুক্রবার (১২ জুন) রাতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় তারা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে এমন আচরণকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অগ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বিসিবি বলেছে, জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক এবং বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনার নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে বোর্ড। তদন্তে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে বিসিবি আরও জানায়, খেলোয়াড়দের কল্যাণ, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নাঈম হাসানের ঘটনায় পরবর্তী পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
কোয়াবের নিন্দা, লিটন-মিরাজদের ক্ষোভ
চট্টগ্রামে নিজ বাসায় ফেরার পথে ডিবি পরিচয়ে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (কোয়াব)। জাতীয় দলের ক্রিকেটার পারভেজ হোসেন ইমনও ক্ষোভ জানিয়ে শাস্তি নিশ্চিতের দাবি তুলেছেন।
এক বিবৃতিতে কোয়াব বলছে, “আমরা চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কর্তৃপক্ষকে নাঈম হাসানের ওপর শারীরিক নির্যাতনে জড়িত প্রত্যেক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।”
সকল ক্রিকেটার নাঈমের পাশে আছে বলেও জানায় কোয়াব। তাদের মতে, দেশের যেকোনো নাগরিকের জন্য এমন ঘটনা অগ্রহণযোগ্য। কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন ইতোমধ্যে নাঈমের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাকে জানিয়েছেন যে দেশের সকল ক্রিকেটার তার পাশে আছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড়
এদিকে, স্পিনার নাঈমের সঙ্গে ঘটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে শাস্তি দাবি করেছেন জাতীয় দলের ওপেনার পারভেজ হোসেন ইমন।
ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, “জাতীয় ক্রিকেট দলের অফ-স্পিনার নাঈম হাসানকে চট্টগ্রামে ডিবি পরিচয়ে জিম্মি করে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ অত্যন্ত নিন্দনীয়, দুঃখজনক এবং উদ্বেগজনক।”
তিনি আরও লেখেন, “একজন জাতীয় দলের খেলোয়াড় দেশের গৌরব ও সম্পদ। তার সঙ্গে এমন আচরণের অভিযোগ শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি নয়, বরং দেশের ক্রীড়াঙ্গনের মর্যাদার ওপরও আঘাত। যে-ই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকুক না কেন, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
নাঈমের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম। তিনি বলেন, “নাঈমের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। যা ঘটেছে, তা আমাকে ব্যথিত ও লজ্জিত করেছে। একজন নাগরিক হিসেবে, একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। নাঈম, আমরা তোমার পাশে আছি।”
তবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, “উনি (নাঈম হাসান) ন্যায়বিচার পাবেন। আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। পুলিশ সদস্য যেই হোক না কেন, আমরা এই ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। কারণ, এটার সঙ্গে পুলিশের ইমেজ জড়িত। আমরা নতুন বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্নে কাজ করছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো কিছুই টলারেট করব না।”
তিনি আরও বলেন, “এখানে চোরাচালান-সংক্রান্ত তথ্য আছে। যেটা আপনারা শুনেছেন, তথ্যের উৎসটাও জেনেছেন, এটি ভেরিফাই করা হবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে উনারা (পুলিশ) গিয়েছেন এবং যাওয়ার প্রক্রিয়াটুকু যথাযথ নিয়ম অনুসারে হয়েছে কি না, সেটা আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখব। পুলিশিং প্রক্রিয়ায় মারধর করার সুযোগ নেই।”
প্রসঙ্গত, ১২ জুন রাতে সাভারে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ শেষে চট্টগ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন নাঈম।
২৬ বছর বয়সী এই বাংলাদেশি স্পিনার বলেন, “আমার প্রিমিয়ার লিগে খেলা চলছিল, আমার ফ্লাইট বিলম্ব হয়েছে। এয়ারপোর্ট থেকে সিএনজি নিয়ে আসছিলাম। রাত ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে লালখান বাজার ফ্লাইওভারের নিচে আমার সিএনজি দাঁড় করানো হয়। ড্রাইভারের কাছ থেকে কাগজপত্র নেয়। আমি পুলিশকে বললাম, দরকার হলে আমার ব্যাগ চেক করেন।”
নাঈম বলেন, “আমাকে গলা চেপে ধরে বলল, ‘তুই গাড়িতে উঠ।’ এই বলে আমাকে গাড়িতে তোলে। আমি বললাম, আপনি আমার গলা টিপে ধরছেন কেন? বলে ধাক্কা দিয়ে বের হয়ে গেলাম। এরপর ওরা গলা টিপে ধরেই আমাকে মেরেছে এবং হেনস্তা করেছে। পুলিশ ছিল দুজন, আরেকজন পাঞ্জাবি পরা লোক ছিল। সে কোনো পরিচয় দেয়নি, পাইপ দিয়ে মারছিল।”
তিনি আরও বলেন, “পরে ১০০-২০০ মানুষ সেখানে জড়ো হয়, তারা আমার পরিচয় দেয়। তবুও আমাকে মারছিল। বলছিল, ‘তুমি আসামি, কথা বলবি না।’ আমি আইডি কার্ড দেখিয়েছি, তবুও ওরা আমাকে মারছিল।”
তিনি অভিযোগ করেন, শুরু থেকেই পুলিশ বৈরী আচরণ করে এবং তিনি কথা বলার চেষ্টা করলে তার গলা চেপে ধরে।
নাঈম বলেন, “পুলিশ, আর্মি আমাদের ডাকলে আমরা নামি, তারা চেক করে ছেড়ে দেয়। কিন্তু গায়ে হাত দেবে কেন? সোর্সটা মারছে, পুলিশও লাঠি দিয়ে মারছে। আমি সুষ্ঠু বিচার চাই। এটা স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার কিছু নেই।”





