বাহক ধরা পড়লেও আড়ালেই রাঘববোয়ালরা

মিয়ানমার থেকে ভোলা হয়ে সারাদেশে মাদকের ট্রানজিট

Sadek Ali
এম শাহরিয়ার ঝিলন, ভোলা
প্রকাশিত: ১:০৯ অপরাহ্ন, ৩০ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২:২৭ অপরাহ্ন, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

তিনদিকে নদী আর একদিকে বঙ্গোপসাগর ‘ভৌগোলিক এই সুবিধাই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্বীপজেলা ভোলার জন্য। মিয়ানমার থেকে শুরু করে টেকনাফ, কক্সবাজার ও নোয়াখালীর ভাসানচর সীমান্ত হয়ে সুমেঘ সমুদ্র ও নৌপথে কোটি কোটি টাকার ইয়াবাসহ মাদকের ভয়াবহ চালান ঢুকছে ভোলায়। মূল লক্ষ্য একটাই ‘ভোলাকে মূল- ট্রানজিট পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক ও নৌপথে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাদকের বিষ ছড়িয়ে দেওয়া। উপকূলের মাছ ধরার ট্রলারকে ঢাল বানিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এই আন্তর্জাতিক চোরাচালান সিন্ডিকেট।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ভোলা থেকে অবৈধভাবে সরকারি সার, সিমেন্ট ও খাদ্যসামগ্রী মিয়ানমারে পাচার করা হচ্ছে এবং ফিরতি ট্রলারে আসছে ইয়াবার বিশাল চালান। সম্প্রতি চরফ্যাশন, লালমোহন ও মনপুরা উপকূলে সার ও অন্যান্য মালামাল জব্দ হলেও, আড়ালেই থেকে যাচ্ছে এর বিপরীতে দেশে ঢোকা মাদকের চালানগুলো।

আরও পড়ুন: পাটগ্রাম সীমান্তে ১ লাখ টাকার ভারতীয় কসমেটিকস ও দুই বাইসাইকেল আটক

এ ছাড়া টেকনাফ ও কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা এবং নোয়াখালীর ভাসানচর থেকে নৌপথে ভোলায় ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক আসার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে কুমিল্লা থেকে লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীর ঘাট হয়ে ভোলার ইলিশা নৌপথ ব্যবহার করেও মাদক ভোলায় আসছে। ভোলায় মাদক ঢোকার পর তা শুধু জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। নৌপথে বরিশাল ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তা পাঠানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে (জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬) ভোলা জেলায় মাদক মামলা হয়েছে ৫৪০টি। আর এতে আটক হয়েছেন ৭৩০ জন। উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে বাহক, খুচরা বিক্রেতা ও সেবনকারীরা আটক হলেও বড় চক্রের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না থাকায় প্রশ্ন উঠছে অভিযান কতটা কার্যকর হচ্ছে।

আরও পড়ুন: শেরপুরে ৫৬ সরকারি প্রাথমিকে নেই প্রধান শিক্ষক

এমনকি খুচরা বিক্রেতা দাবি করছেন, চাপ প্রয়োগ করে মাদক ব্যবসায় জড়ানো হচ্ছে তাদের। আবার কারও অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশ ছাড়া এত বড় নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রাখা কঠিন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোলার দুই মাদক ব্যবসায়ী জানান, মিয়ানমার ছাড়াও টেকনাফ, কক্সবাজার এবং ভাসানচরের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ইয়াবার বড় চালান চরফ্যাশন হয়ে ভোলায় প্রবেশ করে। একেকটি চালানে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকার মাদক আসে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লালমোহনের লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের কাশেম চেয়ারম্যান এবং চরফ্যাশনের আসলামপুর ইউনিয়নের যুবলীগ নেতা সাজাহান, গুডি সিরাজ ও নাসিম এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাদের সঙ্গে তৎকালীন কিছু বিএনপি নেতাও অংশীদার ছিলেন। তবে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর এখন স্থানীয় বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে অভিযোগ।

মাদকের বিস্তার ঠেকাতে জেলায় একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করলেও কার্যক্রমের দৃশ্যমানতা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। বিশেষ করে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিয়মিত অভিযান ও বড় কারবারিদের বিরুদ্ধে তৎপরতা চোখে না পড়লেও দপ্তরের পরিসংখ্যানে নিয়মিত অভিযান ও মাদক উদ্ধারের তথ্য রয়েছে বিস্তার।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংবাদিক আফজাল হোসেন বলেন, মায়ানমার থেকে ভোলায় যে বড় চালান আসে। তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যসহ সকলেরই জানা। তবে তাদের কেনো ধরতে পারছে না। এই মাদক নিয়ে গত ১৭ বছর অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটেছে। থানায় গুলি পর্যন্ত ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এ বিষয়ে প্রশাসন বা সরকার কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আশা করছি বর্তমান যে সরকার আছে তা কঠোর হাতে দমন করবে। কারণ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও প্রসাশনের লোকজন এই মাদকের সাথে জড়িত। এর আগে আমরা দেখেছি ড্রোপটেষ্ট এর কথা বলা হয়েছিলো কিন্তু সেই ড্রোপটেষ্ট কিন্তু সরকার বাস্তবায়ন করেনি। পুলিশ সুপারের সদইচ্ছা থাকে এটা নিরমূল করা সম্ভব।

প্রেসক্লাব সভাপতি নজরুল হক অনু বলছেন, ভোলার প্রায় ৪০০ কিলোমিটার নদী তীর রয়েছে। এ সমস্ত নদী পথে সহজেই মাদক আসছে ভোলায়। এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছু লোককে ধরলেও তাদের তৎপরতা সন্তসজনক নয়। তারা গডফাদারদের ধরতে পারছে না, বড় বড় চালান ধরতে পারছে না। পুলিশ স্থলপথে যে কাজ করছে তাও যথেষ্ট নয়। সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি সমন্বিতভাবে ভোলার চারদিক থেকে একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করতো তাহলে হয়তো তাদের জালে বড় বড় রাঘববোয়ালা ধরা পরতো।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ভোলার পরিদর্শক মোঃ বদরুল হাসান জানান, গত এক বছরে ভোলা জেলায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে ৫৫০টি এতে মামলা হয়েছে ১১০টি। যার মধ্যে নিয়মিত মামলা হয়েছে ৫৭টি, যৌথ মোবাইল কোট হয়েছে ৫৩টি। এতে মোট আসামি  ১২৬ জন। এসময় ৯ কেজি ৬২৩ গ্রাম গাঁজা, ১৮২২ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। এসময় তিনি পরিবহন সংকটের কথাও বলেন।

আর ভোলার বিস্তীর্ণ নদীপথে মাদক ও চোরাচালান ঠেকানোর দায়িত্বে থাকা নৌ পুলিশের দাবি, প্রয়োজনীয় জনবল ও পরিবহন সংকটে তাদের অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি তাদের দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, গত অর্থবছরে মাদকের বিরুদ্ধে নেই একটিও অভিযান বা সাফল্যর তথ্য। ভোলার পূর্ব ইলিশা সদর নৌ থানার অফিসার ইনচার্জ সৈয়দ আশিকুর রহমানের সাথে কথা বললে এই সংকটের কথা জানান তিনি।

তবে উপকূলীয় এলাকায় মাদকসহ অপরাধ দমনে নিয়মিত টহল ও অভিযান অব্যহত রয়েছে বলছে কোস্ট গার্ড। কথা হয় কোস্ট গার্ড দক্ষিণ জোন এর স্টাফ অফিসার (অপারেন্সশ)লেঃ কমান্ডার বিএন, জামিলুর রহমান সাথে তিনি জানান, সম্প্রতি মিয়ানমারে সার, সিমেন্ট, ও খাদ্যসামগ্রী পাচার এবং মাদকের প্রতিরোধে কোস্ট গার্ড ভোলার মনপুরা, চরফ্যাশন ও লালমোহনসহ উপকূলীয় এলাকায় টহল, নজরদারি ও গোয়েন্দাভিত্তিক কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে। সন্দেহভাজন ফিশিং ট্রলার ও অন্যান্য জলযানে নিয়মিত তল্লাশি এবং ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব অভিযানে চোরাচালানকৃত বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট পাচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকা- প্রতিরোধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

ভোলা পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ কাওছার জানান, শুধু বাহক নয়, বড় মাদক কারবারিদের চিহ্নিত করতে কাজ চলছে। তাদের ব্যাংক হিসাব, স¤পদের তথ্য ও সংশ্লিষ্টতার তালিকা তৈরি করে সিআইডি সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে। এবং নিয়মিত তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে।