জনগণের বাজেট এবং গণআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন: সংকট উত্তরণ ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
একটি দেশের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং সামাজিকন্যায় বিচারের সবচেয়ে বড় দর্পণ হলো তার জাতীয় বাজেট। বাজেট কেবল কিছু সংখ্যার খেলা বা আয়-ব্যয়ের হিসাবনিকাশ নয়; এটি হলো আগামী একটি বছর রাষ্ট্র কীভাবে চলবে, নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান কেমন হবে এবং কোন শ্রেণিকে রাষ্ট্র বেশি প্রধান্য দেবে—তার একটি সামষ্টিক দলিল। সম্প্রতি ঘোষিত বাজেটটি নিয়ে নানামুখী আলোচনা, সমালোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। তবে সব তর্ক-বিতর্ক ছাপিয়ে মাঠপর্যায়ের সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—"এই বাজেট জনগণ গ্রহণ করেছে।"
প্রশ্ন উঠতে পারে, তীব্র বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং ডলার সংকটের এই কঠিন সময়েও একটি সাধারণ বাজেট কীভাবে গণআকাঙ্ক্ষাকে স্পর্শ করতে পারল? উত্তরটি লুকিয়ে আছে বাজেটের বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি, সাধারণ মানুষের পকেটের টানকে অনুধাবন করার চেষ্টা এবং সংকটের মুখে দাঁড়িয়েও অতি-উচ্চাভিলাষী না হয়ে মাটির কাছাকাছি থাকার কৌশলের মধ্যে।
আরও পড়ুন: তাগিরা অভিমানী হয় তবে দলের সঙ্গে বেইমানি করে না
সংকট অনুধাবন ও বাস্তবতার মেলবন্ধন
বাজেটকে যখন "জনবান্ধব" বা "জনগণ কর্তৃক গৃহীত" বলা হয়, তার অর্থ এই নয় যে এটি সব সমস্যার এক জাদুকরী সমাধান। বরং এর অর্থ হলো, প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য সরকার যে আন্তরিক প্রয়াস চালিয়েছে, জনগণ তা বুঝতে পেরেছে। বিগত কয়েক বছর ধরে করোনা মহামারীর ধাক্কা এবং পরবর্তী সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধসহ ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আমাদের দেশের বাজারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা যখন দিশেহারা, তখন এই বাজেটে তাদের জন্য এক ধরনের রক্ষাকবচ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: শেকড় থেকে শেখর: ছেঁড়া কাঁথার স্বপ্ন, জাহাজের খবর এবং উন্নয়নের মহাকাব্য
এবারের বাজেটে সবচেয়ে বড় যে দিকটি জনগণের মন জয় করেছে, তা হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে এক নম্বর অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা। সাধারণ মানুষ বড় বড় মেগা প্রজেক্টের চেয়ে তাদের প্রতিদিনের চাল, ডাল, তেল আর নুনের দাম কত রইল—তা নিয়ে বেশি ভাবিত। সরকার এই মনস্তত্ত্বটি ধরতে পেরেছে। নতুন কোনো বড় বিলাসী প্রকল্প হাতে না নিয়ে, চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। এই বাস্তবতাবোধই বাজেটটিকে ড্রয়িংরুমের অর্থনীতিবিদদের খাতা থেকে বের করে হাটের-মাঠের সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: প্রান্তিক মানুষের ভরসা
একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হলো তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকটির পাশে দাঁড়ানো। এই বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা এবং ভাতার পরিমাণ—দুই-ই বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতা: গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই ছোট ছোট অনুদানগুলো একেকটি পরিবারের জন্য কতো বড় আশীবার্দ, তা কেবল সুবিধাভোগীরাই জানেন। ভাতার আওতা বাড়ানোর ফলে লাখো নতুন প্রান্তিক মানুষ এই সুবিধার আওতায় এসেছেন।অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা: সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত এই অংশটির প্রতি বাজেটে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে, যা সরকারের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ।খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি: ওএমএস (OMS) এবং টিসিবির (TCB) মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পণ্য বিতরণের বরাদ্দ বাড়ানোয় নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো অন্তত দুবেলা দুমুঠো খাবারের নিশ্চয়তা পাচ্ছে।
যখন একজন দিনমজুর বা রিকশাচালক দেখেন যে রাষ্ট্র তার আপৎকালীন সময়ে চাল-ডালের জোগান দিতে ভর্তুকি বাড়াচ্ছে, তখন বাজেটের প্রতি তার আস্থা জন্মাতে বাধ্য। জনগণ এই কারণেই বাজেটটিকে নিজেদের বলে মনে করছে।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি: লাইফলাইন রক্ষা
বাংলাদেশ মূলত একটি কৃষিপ্রধান দেশ। শিল্পায়নের ছোঁয়া লাগলেও এ দেশের সিংহভাগ মানুষের জীবন-জীবিকা এখনো মাটির সাথে যুক্ত। এবারের বাজেটে কৃষিখাতকে যে পরিমাণ ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, তা দেশের কৃষক সমাজকে এক বড় ধরনের স্বস্তি দিয়েছে।
"কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে"—এই সনাতন সত্যকে ধারণ করে সার, বীজ, কীটনাশক এবং সেচকার্যে ব্যবহৃত বিদ্যুতে ভর্তুকি বজায় রাখা হয়েছে।
পাশাপাশি, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের কৃষকরা প্রতিবছরই বন্যা, খরা বা জলোচ্ছ্বাসের মুখোমুখি হচ্ছেন। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বাজেটে যে বিশেষ তহবিলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করবে। গ্রামে যদি উৎপাদন ঠিক থাকে, তবে শহরের বাজারেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য—এই চেইন ইকোনমিকে সচল রাখার দূরদর্শী পরিকল্পনাই জনগণের এই বাজেট গ্রহণের অন্যতম কারণ।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত: মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত নিয়ে বরাবরের মতোই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে আকাশচুম্বী। এবারের বাজেটে এই দুই খাতে বরাদ্দ টাকার অঙ্কে বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদানের যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, তা তরুণ প্রজন্ম ও অভিভাবকদের আশাবাদী করেছে। বিশেষ করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় জোর দেওয়া এবং ফ্রিল্যান্সিং বা আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য তরুণদের আইসিটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা সমাদৃত হয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতে মাঠপর্যায়ের হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মানোন্নয়নে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের বড় ক্ষোভ থাকে চিকিৎসার পেছনে পকেট থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ হয়ে যাওয়া নিয়ে। বাজেটে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে ওষুধের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার যে গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে, তা যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় অনেক কমে আসবে।
কর কাঠামো ও মধ্যবিত্তের স্বস্তি
বাজেট এলেই মধ্যবিত্তের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে—এই বুঝি করের বোঝা আরও বাড়ল! তবে এবারের বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা হয়েছে। যারা কর দেওয়ার যোগ্য, তাদের কর জালের আওতায় আনার চেষ্টা করা হলেও, করের হার বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ দেওয়া হয়নি। বিলাসী পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, তা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করছে। মেইড ইন বাংলাদেশ (Made in Bangladesh) বা দেশে উৎপাদিত পণ্যের কর রেয়াত তরুণ উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
জনগণ বাজেটটি গ্রহণ করেছে এর ইতিবাচক দিকগুলোর জন্য, তবে এর অর্থ এই নয় যে এটি পুরোপুরি চ্যালেঞ্জমুক্ত। যেকোনো বাজেটের সফলতার চাবিকাঠি হলো তার শতভাগ এবং স্বচ্ছ বাস্তবায়ন। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চিরচেনা সংকট রয়েছে:
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা: লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হলে ঘাটতি বাজেট মেটাতে সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিতে হয়, যা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে সংকুচিত করতে পারে।
অপচয় ও দুর্নীতি রোধ: বরাদ্দের টাকা যেন মাঝপথে অপচয় বা দুর্নীতির গ্রাসে না পড়ে, সে জন্য কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
প্রকল্পের সময়মতো সমাপ্তি: প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ব্যয়ের অঙ্ক বাড়িয়ে দেয়, যা জনগণের ট্যাক্সের টাকার অপচয় ঘটায়।
জনগণ যখন এই বাজেটকে সাদরে গ্রহণ করেছে, তখন সরকারের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দক্ষতার পরিচয় দিয়ে এই বাজেটের প্রতিটি টাকা জনগণের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে।
উপসংহার
সবশেষে বলা যায়, একটি নিখুঁত বা জাদুকরী বাজেট তৈরি করা কোনো দেশের পক্ষেই সম্ভব নয়, বিশেষ করে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায়। তবে একটি কল্যাণমুখী এবং সংবেদনশীল বাজেট তৈরি করা অবশ্যই সম্ভব, যেখানে নাগরিকের কান্নার আওয়াজ নীতি নির্ধারকদের কানে পৌঁছায়। এবারের বাজেটটি সেই সংবেদনশীলতারই বহিঃপ্রকাশ।
এতে যেমন একদিকে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনকে রাঙানোর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রয়াস। এটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ঊর্ধ্বে উঠে আমজনতার বাজেট হয়ে উঠতে পেরেছে বলেই চারদিক থেকে ইতিবাচক ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। জনগণের এই অকুণ্ঠ সমর্থনকে শক্তিতে রূপান্তর করে সরকার যদি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো শক্ত হাতে মোকাবেলা করতে পারে, তবে এই বাজেটই হবে সংকট পেরিয়ে সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার এক মজবুত ভিত্তি।
লেখক: মমিনুল ইসলাম, সাংবাদিক।





