বয়স্ক ভাতা: প্রবীণদের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনছে?

Any Akter
মোঃ মাহির ফয়সাল
প্রকাশিত: ১২:২০ অপরাহ্ন, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১:০০ অপরাহ্ন, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশের জনমিতিক কাঠামো খুব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। দেশটি একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি  চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটি একদিকে যেমন ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত, সেই বাস্তবতার সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি জনসংখ্যাগত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। যে পরিবর্তন নিয়ে আরও আগেই আমাদের সতর্ক হওয়ার দরকার ছিল।  সেটি হলো দেশের ক্রমবর্ধমান  ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠী, যাদের আমরা প্রবীণ হিসেবে চিহ্নিত করি । বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯.৫ শতাংশের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি, যা বর্তমান মোট জনসংখ্যার দেড় কোটিরও বেশি। অন্যদিকে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতির ফলে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ও মোট জনসংখ্যায় তাদের অনুপাত ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশই হবে প্রবীণ জনগোষ্ঠী যা সংখ্যার দিক থেকে প্রায় ৫ কোটি। 

সমস্যাটি ঠিক এখানেই। বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ে থাকলেও পরিসংখ্যানগত বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, দেশের প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ও তাদের আর্থিক অবস্থার চিত্র এখনো কিছুটা ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১.৪ শতাংশে পৌঁছেছে। যখন একটি দেশ এবং তার এই সুবিশাল জনগোষ্ঠী একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট ও বিভিন্ন বাধার মুখে থাকে, তখন সরকারের পক্ষে নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সেবা ও সহায়তা নিশ্চিত করা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে।  এই বাস্তবতায় আমাদের প্রবীণ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে যারা দরিদ্র ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল  তারা আরও বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন।  

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ: মরীচিকার পেছনে এক লক্ষ্যহীন যাত্রা

ক্রমবর্ধমান নগরায়ন, বর্তমান প্রজন্মের মানসিক, আর্থিক বাস্তবতার পাশাপাশি সামাজিক পরিবর্তনের ফলে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক নিরাপত্তা এবং পারিবারিক-সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।  বাংলাদেশ সরকার দরিদ্র প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যার মধ্যে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি অন্যতম। ১৯৯৭–৯৮ অর্থবছরে চালু হওয়া এই কর্মসূচির লক্ষ্যই হলো প্রবীণদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সহায়তা করা, তাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করা এবং পরিবার ও সমাজে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা । বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী পুরুষ এবং ৬২ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীরা মূলত বয়স্ক ভাতা পাওয়ার জন্য যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন। বর্তমানে এই ভাতার পরিমাণ মাসে ৬৫০ টাকা। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, বাজেটসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বয়স ও আর্থিক প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই কর্মসূচির বাইরে থেকে যায়। 

একজন দরিদ্র প্রবীণ ব্যক্তির জীবনে বয়স্ক ভাতার গুরুত্ব বোঝার জন্য বাস্তবতার দিকে তাকানো প্রয়োজন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যায়। দীর্ঘদিন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই  করতে করতে অনেকেই প্রবীণ বয়সে পৌঁছানোর আগেই শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন।এর ওপর যাদের সঞ্চয়, নিয়মিত আয় বা পেনশন নেই, তাদের জন্য জীবনধারণের দৈনন্দিন ব্যয়, ওষুধ এবং চিকিৎসার মেটানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।  

আরও পড়ুন: ৪৮তম জন্মবার্ষিকীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতি নিবেদিত কাব্য

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে আমাদের সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় বয়স্ক ভাতা বাংলাদেশে প্রবীণদের সামগ্রিক কল্যাণে কী ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলে তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটিতে বিশেষভাবে দেখা হয়েছে। এক্ষেত্রে ভাতাপ্রাপ্ত ও ভাতাপ্রাপ্ত  নন উভয় ধরণের প্রবীণদের  অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।  ভাতাপ্রাপ্ত প্রবীণরা ভাতা পাওয়ার পর তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, যারা ভাতাপ্রাপ্ত  নন তারা  বয়স্ক ভাতা পেলে তাঁদের জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারত সে বিষয়ে তাদের মতামত প্রকাশ করেছেন। উক্ত গবেষণাটি বাংলাদেশের অন্যতম দরিদ্র বিভাগ রংপুরে পরিচালনা করা হয় যেখানে মোট ৩০৯ জন প্রবীণের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ২০৬ জন বয়স্ক ভাতার সুবিধাভোগী এবং ১০৩ জন ছিলেন ভাতা না পাওয়া প্রবীণ। উক্ত গবেষণায় শহরাঞ্চল থেকে ১৫৫ জন এবং গ্রামাঞ্চল থেকে ১৫৪ জন প্রবীণ অংশ নেন।     

গবেষণায় দেখা যায়, ভাতাপ্রাপ্ত ও ভাতা না পাওয়া  উভয় শ্রেণীরই মতামতে তাদের জীবনে বয়স্ক ভাতার  ইতিবাচক প্রভাব খুব স্পষ্ট। ভাতাপ্রাপ্ত প্রবীণদের ৮৪.৯ শতাংশ মনে করেন, ভাতা পাওয়ার পর তাঁদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে।  অন্যদিকে ভাতা না পাওয়া প্রবীণদের সবাই মনে করেন, ভাতা পেলে তাঁদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়তে পারতো। বয়স্ক ভাতার টাকা দিয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও ভাতাপ্রাপ্ত প্রবীণদের ৭০.৮ শতাংশ এবং ভাতা না-পাওয়া প্রবীণদের ৯৯ শতাংশ ইতিবাচক মত দিয়েছেন। চিকিৎসার ক্ষেত্রে ভাতাপ্রাপ্ত প্রবীণদের ৪৪.১ শতাংশ এবং ভাতা না-পাওয়া প্রবীণদের ৮২.৫ শতাংশ ইতিবাচক মত দিয়েছেন যে ভাতার টাকা  তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণে সহায়তা করে বা করবে।  কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে এই হার যথাক্রমে ২৭.৭ শতাংশ ও ৪৭.৬ শতাংশ, যার মানে ভাতার টাকা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে খুব বেশি সাহায্য করে না। 

উক্ত গবেষণায় মানসিক সন্তুষ্টি ও পারিবারিক-সামাজিক ক্ষেত্রেও বয়স্ক ভাতার ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। উভয় গোষ্ঠীর প্রায় ৯৪ শতাংশ মনে করেন, বয়স্ক ভাতা তাদের মানসিক সন্তুষ্টি বাড়াতে সহায়তা করে। উভয় গোষ্ঠীর প্রবীণদের প্রায় ৫০ শতাংশই মনে করেন, ভাতা পাওয়ার ফলে তাদের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও পরিবারে মর্যাদা বৃদ্ধি পায় বা পেতে পারে। পাশাপাশি, সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বয়স্ক ভাতার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। ভাতাপ্রাপ্ত প্রবীণদের ৮২.৫ শতাংশ জানিয়েছেন, ভাতা পাওয়ার পর প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ বেড়েছে।   

গবেষণার আলোকে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে ভাবার সুযোগ রয়েছে। বর্তমান মূল্যস্ফীতি আর অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রবীণদের খাদ্য, ওষুধ ও চিকিৎসার প্রয়োজন বিবেচনায় বয়স্ক ভাতার পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রবীণদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করে ভাতার আওতা বাড়াতে হবে। ভাতাভোগী নির্বাচন ও ভাতা বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা  নিশ্চিত করার পাশাপাশি শহর ও গ্রামের জীবনযাত্রার ব্যয় ও আর্থিক বাস্তবতার পার্থক্যও ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি । মনে রাখা প্রয়োজন বয়স্ক ভাতা শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, এটি প্রবীণদের মানসিক তৃপ্তি,  সামাজিক ও পারিবারিক মর্যাদার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগ। 


 লেখক পরিচিতি: মোঃ মাহির ফয়সাল (সহকারী অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)