গুলশানে উধাও বাড়ির মালিক, ভেতরে অভুক্ত ১১ বিদেশি কুকুর
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-২-এর ৪৭ নম্বর রোডের বিশাল আকারের বাড়ির মালিক দীর্ঘদিন ধরে উধাও হয়ে গেছেন। সামনের দুটি ফটক ও চারপাশে অনেক উঁচু পর্যন্ত কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা বাড়িটির আশপাশের কেউ এর ভেতরের খোঁজ নিচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে বাড়ির মালিক পলাতক থাকার সুযোগে দুর্বৃত্তরা পরিত্যক্ত এ বাড়িটির মূল্যবান মালামাল ও চারটি বিলাসবহুল গাড়ির যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে গেছে। মালিকের বিদেশি ১১টি কুকুর দীর্ঘদিন ধরে অর্ধাহারে-অনাহারে থাকতে থাকতে এখন মৃত্যুর মুখোমুখি। আশপাশের লোকজন বাইরে থেকে পাউরুটি, মুড়ি ও অন্যান্য খাবার দিচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গুলশান-২ এলাকার ৪৭ নম্বর সড়কের ১১ নম্বর বাড়িটি একতলা বিশিষ্ট, সবুজ গাছপালায় বেষ্টিত অবস্থায় পরিত্যক্ত পড়ে আছে। ‘শান্তি নীড়’ নামের বাড়িটি রাজউকের প্লট সি-ডব্লিউ-এন (এ)-২২ নম্বরে অবস্থিত। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরবর্তী কোনো এক সময়ে বাড়ির মালিক প্রধান ফটকে তালা দিয়ে পরিবারসহ পালিয়ে যান। আশপাশের লোকজন এরপর এ বাড়িতে প্রকাশ্যে কাউকে ঢুকতে দেখেনি। জানা যায়, রাতের আঁধারে মালিকের কোনো লোক অথবা বাড়িটি দখল করার অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তি মাঝে মাঝে গোপনে ঢুকে খোঁজখবর নিত। দিনের বেলায় কখনো এই বাড়ির আশপাশে কাউকে দেখা যেত না। সামনের ফটক সব সময় তালাবদ্ধ থাকত।
আরও পড়ুন: ঢাকায় বিমানবন্দর এলাকায় প্রবাসীদের ভোগান্তি কমাতে ৮২ দালাল, ভবঘুরে গ্রেপ্তার
বাড়ির উঁচু দেয়াল টপকে কাঁটাতারের বেড়া ফাঁক করে দুর্বৃত্তচক্র ঢুকে বছরজুড়ে বাড়ির মালামাল চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিল। স্থানীয় সূত্র জানায়, গুলশান থানা থেকে একাধিকবার পুলিশ এসে কয়েকজন চোরকে ধরে মালামাল উদ্ধার করেছিল। কিন্তু সব সময়ই বাড়ির প্রধান দুটি ফটক তালাবদ্ধ থাকত। বাড়িতে বিদেশি ১১টি কুকুর অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করে অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছে এলাকাবাসী। আশপাশের ১০ নম্বর ও ১২ নম্বর বাড়ির বাসিন্দারা এ বিষয়ে কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান।
তবে আশপাশের দায়িত্বরত গার্ড ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘ দুই বছর ধরে বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকার সুযোগ নিয়ে কোনো প্রভাবশালী চক্র বাড়িটি দখলের পাঁয়তারা করছে। নির্জন পরিস্থিতির সুযোগে দুর্বৃত্তরা ঢুকে বাড়িতে থাকা চারটি বিলাসবহুল গাড়ির সব যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে যায়। বাড়ির আসবাবপত্র থেকে শুরু করে ভবনের প্লাস্টার, বৈদ্যুতিক তার ও পাইপ পর্যন্ত চুরি করে নিয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে আনসারের টিডিপি অ্যাডভান্সড কোর্স চলমান, অংশ নিচ্ছেন ৮০০ প্রশিক্ষণার্থী
পরিত্যক্ত বাড়িতে লুটপাট এবং ১১টি কুকুরের অনাহারে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার খবর পেয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গত তিনদিন ধরে বাড়ির তালা খুলে ঢুকেছেন হাফিজুর রহমান নামে এক কেয়ারটেকার। তিনি শ্রমিক দিয়ে লুটপাট হওয়া বাড়িটি পরিষ্কার করছেন। বাড়িটির মালিক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি মালিককে চেনেন না। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এক ‘ম্যাডাম’ তাকে বাড়িটি পরিষ্কার করার দায়িত্ব দিয়েছেন।
বাড়ির ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, ১১টি কুকুর একতলা বিশিষ্ট বাড়িটির নিচের বিশাল এলাকায় খাবারের জন্য ছোটাছুটি করছে। হাফিজুর রহমান শ্রমিকদের দিয়ে কুকুরগুলোর জন্য মুড়ি দিচ্ছেন। উন্নত জাতের বিদেশি কুকুরগুলো মুড়ি খাচ্ছে না। দীর্ঘদিন না খেতে পেয়ে কুকুরগুলো কঙ্কালসার হয়ে গেছে। হাফিজুর রহমান জানান, ওই ম্যাডাম মাঝে মাঝে তাদের জন্য খাবার পাঠান। তবে এই ‘ম্যাডাম’ কে—সে সম্পর্কেও তিনি কোনো তথ্য দেননি।
স্থানীয়দের সন্দেহ, মালিক পালিয়ে যাওয়ার পর পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা এই বাড়িটি নতুন কোনো ভূমিদস্যু চক্র দখলের পাঁয়তারা করছে।
দুপুরে বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ২০ কাঠা জমির ওপর একতলা বিশিষ্ট মূল ভবন। পাশে কিচেন, গার্ড শেড ও সার্ভেন্টস কোয়ার্টার। মূল ভবনের সামনে শিশু পার্ক ও বৈকালিক আড্ডার টেবিল রয়েছে। ভেতরে সব মালামাল ভাঙচুর করা। মূল ড্রয়িংরুমে অনেকগুলো খালি মদের বোতল দেখা যায়। নিচতলা থেকে ছাদে ওঠার জন্য সুন্দর সিঁড়ি রয়েছে। ভেতরের পরিবেশ দেখেই বোঝা যায়, নিচতলায় চারটি দামি গাড়ি পার্কিং করা হতো। অভিজাত পরিবারের বসবাসের উপযোগী সাজসজ্জা ছিল পুরো বাড়িতে। আসবাবপত্রসহ মূল্যবান মালামাল লুটপাট হয়ে গেছে। অবশিষ্ট মালামাল হাফিজুর রহমান কয়েকজন শ্রমিক দিয়ে প্যাকেট করে অন্যত্র নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এ বিষয়ে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দাউদ হোসেন বলেন, বাড়িটির কোনো মালিককে দীর্ঘদিনেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সুযোগ পেলেই চোরেরা বাড়িতে ঢুকে মূল্যবান মালামাল নিয়ে যাচ্ছে। পুরো দুর্বৃত্তচক্র ভেতরে ঢুকে মাদক সেবন করে—এমন অভিযোগও রয়েছে। এলাকাবাসীর কেউ এই বাড়িটির মালিকানা বা পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে চাচ্ছে না।
ওসি দাউদ হোসেন আরও বলেন, প্রতিদিন এমন খবর পেয়ে তিনি নিজে একাধিকবার দেয়াল টপকে ভেতরে গিয়েছেন। ভেতরের প্রায় সব মালামাল লুট হয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও মালিককে এখনো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। গণআন্দোলনের সময় পলাতক সরকারের কেউ হয়তো এ বাড়িতে থাকতেন এবং ৫ আগস্টের পর পালিয়ে গেছেন। তবে এ বিষয়ে কেউ কোনো তথ্য দেয়নি।
বাড়িটির মালিকের সন্ধান থানা পুলিশ ও আশপাশের কেউ দিতে পারেনি। গুলশান সোসাইটির সভাপতি ওমর সাদাত বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, ৪৭ নম্বর রোডের ১১ নম্বর বাড়িটির মালিক সম্পর্কে আমাদের কোনো তথ্য জানা নেই। বাড়ির মালিক উধাও হয়ে যাওয়া এবং আটকে পড়া ১১টি বিদেশি কুকুরের বিষয়ে তিনি জানান, আশপাশের কেউ এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করেনি। আমাদের গুলশান সোসাইটিতে ১২ হাজারেরও বেশি সদস্য ও বাড়ির মালিক রয়েছেন। সবার তথ্য আমাদের মনে থাকা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ দিলে আমরা খতিয়ে দেখব।





