সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে বলছেন বিশেষজ্ঞরা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই নিয়ে চরম অশ্লীলতা

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১০:০৬ অপরাহ্ন, ০৪ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১০:০৬ অপরাহ্ন, ০৪ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

জুলাই গণ-আন্দোলনের দ্বিতীয় বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, মতপ্রকাশের সাংবিধানিক স্বাধীনতার আড়ালে মানহানি, অশ্লীল ভাষা, সহিংসতায় উসকানি কিংবা ব্যক্তিগত চরিত্রহননের সুযোগ নেই। এসব কর্মকাণ্ড আইন লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়লে রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান কুরুচিপূর্ণ ভাষা ও অসহিষ্ণুতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করছে এবং রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।

জুলাই আন্দোলনের বার্ষিকী ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে অশালীনতার বিস্তার: 

আরও পড়ুন: অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা চালুর প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

জুলাই গণ-আন্দোলনের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আন্দোলনকে ঘিরে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতামত প্রকাশিত হচ্ছে। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তিনির্ভর বিতর্কের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশ্লীল ভাষা, মানহানিকর মন্তব্য, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা এবং সহিংসতার আহ্বান উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলেও সেই স্বাধীনতা কখনোই আইন লঙ্ঘন, সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি কিংবা অন্যের সম্মান ক্ষুণ্ন করার বৈধতা দেয় না।

আরও পড়ুন: জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি বা দলের অর্জন নয়: প্রধানমন্ত্রী

অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী: রাজনৈতিক ভাষার অবক্ষয় গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত: 

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, দেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং শত্রু হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, সংসদেও অনেক সময় আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হয়। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বিদ্রূপ, টিটকারি ও অপমান করার প্রবণতা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর ভাষায়, “রাজনীতিবিদদের আগে নিজেদের ভাষা ও আচরণের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। রাজনৈতিক শালীনতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ক্ষমতাসীনদের থেকেই শুরু হওয়া উচিত। কিন্তু নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও আমি সেই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না।”

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়, তখন তার নেতিবাচক প্রভাব সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীলতা ও বিদ্বেষের বিস্তারের পেছনেও এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির বড় ভূমিকা রয়েছে।

জেড আই খান পান্না: এটি এখন সমষ্টিগত সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে: 

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জেড আই খান পান্না বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনীতিতে অশালীন ভাষার ব্যবহার এখন একটি সমষ্টিগত সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন,“বর্তমান সময়ের অনেক রাজনৈতিক দল এই সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এমনকি নতুন রাজনৈতিক দলের তরুণ নেতারাও অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করছেন, অথচ অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রশংসিত হচ্ছেন। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার জন্য ক্ষতিকর।”

তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত অপমান, কুরুচিপূর্ণ ভাষা কিংবা বিদ্বেষ ছড়ানো কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ হতে পারে না।

তার মতে, আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে সমানভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

শাওনের পোস্টকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: 

সম্প্রতি প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী ও অভিনয়শিল্পী মেহের আফরোজ শাওন-এর একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

পোস্টটির সমালোচনা করতে গিয়ে অসংখ্য ব্যবহারকারী ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশ্লীল ভাষা, নারীবিদ্বেষী মন্তব্য, মানহানিকর বক্তব্য এবং সহিংসতার আহ্বানমূলক মন্তব্য করেন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, কোনো বক্তব্যের প্রতিবাদ করার সাংবিধানিক অধিকার থাকলেও তার জবাবে আইন লঙ্ঘনকারী ভাষা বা সহিংসতার উসকানি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

শিক্ষকের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন: 

একই সময়ে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত ভাষা নিয়েও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

শিক্ষার্থী, সাবেক শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন—যারা শিক্ষক, গবেষক কিংবা বুদ্ধিজীবী হিসেবে সমাজে আদর্শিক অবস্থানে রয়েছেন, তাদের বক্তব্যে যদি সংযম ও দায়িত্বশীলতা না থাকে, তাহলে সমাজে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে কীভাবে?

তিনজনের নামে শাহবাগ থানায় জিডি: 

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, মাহিয়া মাহি এবং শান্তা ফারজানার বিরুদ্ধে শাহবাগ থানা-এ একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। অভিযোগটি করেছে 'রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম' নামে একটি সংগঠনের তিনজন পদধারী সদস্য। 

অভিযোগে বলা হয়েছে:

জুলাই আন্দোলনকে কটাক্ষ ও অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

শাওনের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত কিছু ভিডিও বার্তায় জুলাই আন্দোলনকে "পরিকল্পিত" বা "সাজানো" হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগ করা হয়েছে।

শান্তা ফারজানার বিরুদ্ধে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভকে অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছে।

মাহিয়া মাহির বিরুদ্ধেও জুলাই আন্দোলন নিয়ে অপপ্রচার ও কটাক্ষের অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। 

এরআগে প্রবাসে অবস্থানরত সেফাত উল্লাহ ওরফে ‘সেফুদা’ অন্তত ২০১৮ সালের আগ থেকেই ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ ও আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করে আসছিলেন। ২০১৮ সালে তার ভিডিওগুলো ব্যাপকভাবে ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচিত হয় এবং তিনি এসব বক্তব্যের কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। 

পুলিশের অবস্থান: ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগটি গ্রহণ করে তা সাইবার ক্রাইম ইউনিটে তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ: 

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক মতপার্থক্য অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তিনির্ভর আলোচনার পরিবর্তে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও চরিত্রহননের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।

তাদের মতে—

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অশ্লীলতা বা মানহানির অধিকার নয়।

ব্যক্তিগত সম্মানহানি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সহিংসতার উসকানি আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপরিচিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব আরও বেশি, কারণ তাদের বক্তব্য দ্রুত লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয় রোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতাও জরুরি।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইন লঙ্ঘনকারী, অশ্লীল ভাষা ব্যবহারকারী, মানহানিকর বক্তব্যদাতা এবং সহিংসতায় উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং নাগরিক সমাজকে দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাই আন্দোলনসহ যেকোনো জাতীয় ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সেই মতপার্থক্যের প্রকাশ হতে হবে তথ্য, যুক্তি ও গণতান্ত্রিক শালীনতার ভিত্তিতে। অশ্লীলতা, বিদ্বেষ, মানহানি কিংবা সহিংসতার আহ্বান কোনো সভ্য সমাজ বা আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতির ভিত্তিতেই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।