“৮ বছর টিকা বন্ধ” বনাম “নিয়মিত টিকাদান”—স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভেতরেই দ্বন্দ্ব, হামে ১০০ শিশুমৃত্যুতে উদ্বেগ

Sanchoy Biswas
এম এম লিংকন
প্রকাশিত: ৮:৫৭ অপরাহ্ন, ২৯ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ৮:৫৭ অপরাহ্ন, ২৯ মার্চ ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে অন্তত ১০০ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়লেও, টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে স্বাস্থ্য খাতের ভেতরেই তৈরি হয়েছে সাংঘর্ষিক অবস্থান। একদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর দাবি—গত ৮ বছর টিকা দেওয়া হয়নি; অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান অব্যাহত রয়েছে। এই দ্বৈত বক্তব্য স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমন্বয়, জবাবদিহি ও বাস্তব চিত্র নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

সংসদীয় বৈঠকে প্রকাশ—সারাদেশে অন্তত ১০০ শিশুমৃত্যু: 

আরও পড়ুন: রাজশাহী মেডিকেলে ১১ দিনে ৩৩ শিশুর মৃত্যু: ক্ষোভে ফুঁসছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

রোববার সরকারি দলের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবে দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১০০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বৈঠক শেষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নজরে এসেছে।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সফল কিডনি প্রতিস্থাপন

তিনি বলেন, “তারেক রহমান পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দুই মন্ত্রীকে সারা দেশ ঘুরে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।”

সাবহেড ২: একাধিক জেলায় ছড়িয়ে পড়া প্রাদুর্ভাব—সংক্রমণের বিস্তার উদ্বেগজনক

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কমপক্ষে সাত জেলায় হামের বড় আকারে প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

ঢাকা, ময়মনসিংহ, পাবনা, চট্টগ্রাম ও নাটোরে আক্রান্ত বেশি। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভোলা, পটুয়াখালী, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জেও রোগী শনাক্ত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ১৮ মার্চ রাজশাহী বিভাগে ১৫৩ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৪৪ জন হামের রোগী শনাক্ত হওয়া সংক্রমণের তীব্রতা নির্দেশ করে।

সাবহেড ৩: মন্ত্রীর বক্তব্য বনাম মাঠপর্যায়ের তথ্য—স্পষ্ট সাংঘর্ষিক অবস্থান

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “গত ৮ বছর কোনো সরকার হামের টিকা দেয়নি। এ কারণে সম্প্রতি দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।”

অন্যদিকে ইপিআই কর্মসূচির পরিচালক ডা. সাজ্জাদ সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে বলেন—“ইপিআই তে হামের টিকা নিয়মিত দেওয়া হয়। এছাড়া সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্র এটিকা নিয়মিত দেওয়া হয়।”

তিনি আরও বলেন—“তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদারকের ঘাটতি ও শিশুর মায়েদের অবহেলার কারণে কিছু শিশু হামের টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।”

টিকাদানের অগ্রগতি প্রসঙ্গে তার বক্তব্য—“এমআরআইওয়ান ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার শিশু রয়েছে ৯২ পার্সেন্ট, এমআরআই টু অর্থাৎ ১৫ মাস পূর্ণ হওয়া রয়েছে ৯০ শতাংশ।”

এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য স্বাস্থ্য খাতে তথ্য বিভ্রান্তি ও নীতিগত অসামঞ্জস্যের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সাবহেড ৪: টিকা মজুদ থাকলেও সিরিঞ্জ সংকট—কার্যক্রম বাস্তবায়নে বাধা

ডা. সাজ্জাদ জানান, দেশে বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ডোজ হামের টিকা মজুদ রয়েছে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন—“সব ভ্যাকসিনের সিরিঞ্জ এবং লজিস্টিক সাপোর্ট বর্তমানে নেই।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন—“গ্লোবাল এয়ারলাইন্স ফর ইনোসিয়েটিভ জুনের মধ্যে সরবরাহ করবে বলে প্রত্যাশা করছি।”

এছাড়া তিনি বলেন—“ইতোমধ্যে এ সহায়তা প্রতিষ্ঠানটিকে এসব লজিস্টিক সাপোর্টের জন্য আবেদন করা হয়েছে।”

উল্লেখ্য, ২০১৬ ও ২০২০ সালে এই আন্তর্জাতিক সহায়তায় বড় পরিসরে টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানো হলেও ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তা হয়নি।

 চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা—সতর্কতায় ৯৮% সুস্থতা সম্ভব

রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ রোববার বাংলাবাজার পত্রিকা কে বলেন—“হামে আক্রান্ত শিশুকে আইসোলেটেড (আইসোলেশন) করতে হবে। এতে ৯৮% শিশু সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।” প্রতিবছর হামের টিকা দেওয়া হয় বলে তিনিও উল্লেখ করেন। 

তিনি আরও বলেন—“সাবধানতার সহিত যত্ন নিলে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।”

চিকিৎসকদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা রুবেওলা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকলে প্রায় ৯০% ক্ষেত্রে সংক্রমণ ঘটে।

প্রথমে জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও চোখ লাল হওয়া—এরপর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে। জটিল হলে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো প্রাণঘাতী অবস্থা তৈরি হতে পারে।

জরুরি প্রস্তুতির দাবি—হাসপাতাল প্রস্তুত, তবু প্রশ্ন সমন্বয়ে: 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রস্তুতি নয়—মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন, টিকাদানে সমন্বয় এবং তথ্যের স্বচ্ছতা—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।

একদিকে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভেতরেই টিকাদান নিয়ে সাংঘর্ষিক বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।

এই অবস্থায় জরুরি হয়ে উঠেছে— সঠিক তথ্যের একক ব্যাখ্যা, কার্যকর তদারকি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা। অন্যথায়, হামের এই প্রাদুর্ভাব শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়—একটি বড় প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতীকে পরিণত হতে পারে।