পুলিশ ইউনিফর্মে ‘নীতিগত ব্যত্যয়’. সদস্যদের মতামত উপেক্ষায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ

Any Akter
এম এম লিংকন
প্রকাশিত: ৮:৪৪ অপরাহ্ন, ২৮ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ৮:৪৪ অপরাহ্ন, ২৮ মার্চ ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

#জরিপে ৯৬.৫৭% আগের পোশাকের পক্ষে  বর্তমান ইউনিফর্মে আস্থা মাত্র ০.৮৪%

#পুনর্বিবেচনার সংকেত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

আরও পড়ুন: বিএনপি'র এমপিদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

পুলিশ বাহিনীর ইউনিফর্ম নির্ধারণে প্রাতিষ্ঠানিক মতামত উপেক্ষা, কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা বিবেচনায় ঘাটতির অভিযোগ এখন আর বিচ্ছিন্ন সমালোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি স্পষ্টতই একটি নীতিগত ও প্রশাসনিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ জরিপে বর্তমান ইউনিফর্মের প্রতি ব্যাপক অনাস্থা প্রকাশ পাওয়ার পর বিষয়টি পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ফলে ইউনিফর্ম নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে—তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

শনিবার (২৮ মার্চ) রাজশাহীর সারদায় পুলিশ একাডেমিতে ৪৩তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের শিক্ষানবিশ এএসপিদের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান ইউনিফর্মে পুলিশ সন্তুষ্ট নয়। ঐতিহ্যসম্মত পূর্বের কোনো একটি পোশাকে ফেরার বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

আরও পড়ুন: কৃত্রিম জ্বালানি সংকট ও পাচার রোধে কঠোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

নীতিগত প্রশ্ন ও কার্যকারিতা সংকট: 

পুলিশ সদর দপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জরিপের ফলাফল ইউনিফর্ম ইস্যুকে আরও জটিল করে তুলেছে। এতে দেখা যায়, মাত্র ০.৮৪ শতাংশ সদস্য বর্তমান পোশাকে সন্তুষ্ট; বিপরীতে ৯৬.৫৭ শতাংশ সদস্য আগের ইউনিফর্মে ফেরার পক্ষে এবং ২.৫৯ শতাংশ নতুন ডিজাইনের পক্ষে মত দিয়েছেন।

এই পরিসংখ্যান কেবল পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়; বরং এটি একটি বৃহৎ পেশাগত বাহিনীর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উদ্বেগের প্রতিফলন। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ—‘লৌহ রঙের’ ইউনিফর্ম রাতে দৃশ্যমানতা কমায়, অন্য বাহিনীর সঙ্গে বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়, ইউনিফর্ম নির্ধারণে সদস্যদের গায়ের রং, আবহাওয়া ও পেশাগত বাস্তবতা উপেক্ষিত হয়েছে—যা একটি “অপরিকল্পিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত”-এর ইঙ্গিত বহন করে।

প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন: 

ইউনিফর্ম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ঘিরে আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৪১ কোটি টাকার কাপড় ক্রয়ের দরপত্র একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হয়, যার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ রয়েছে।

যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি, তবুও রাষ্ট্রীয় ক্রয়প্রক্রিয়ায় যথাযথ যাচাই-বাছাই ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছে কিনা—তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের ইউনিফর্ম নির্ধারণে এ ধরনের বিতর্ক প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

সংস্কার প্রেক্ষাপট ও বিতর্ক: 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামোগত সংস্কারের অংশ হিসেবে ইউনিফর্ম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ, র‍্যাব ও আনসারের জন্য নতুন পোশাক নির্ধারণ করে।

তবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে র‍্যাব ও আনসারের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হলেও পুলিশের ক্ষেত্রে তা কার্যকর করা হয়। ১৪ নভেম্বর থেকে মহানগর পুলিশে নতুন ইউনিফর্ম চালু হয় এবং পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়ে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

সমালোচকদের মতে, সংস্কারের নামে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক পরামর্শ ও গবেষণাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

মনোবল ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: 

পুলিশ বাহিনীর একটি বড় অংশ মনে করছে, ইউনিফর্ম নিয়ে অসন্তোষ তাদের মনোবলে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মনোবল দুর্বল হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া স্বাভাবিক।

সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম এ বিষয়ে বাজার পত্রিকাকে শনিবার বলেন, “পোশাক বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলার প্রতীক। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ইউনিফর্ম পরিবর্তন করা অযৌক্তিক।” তিনি আগের ইউনিফর্মকে সময়োপযোগী ও কার্যকর বলে উল্লেখ করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউনিফর্ম কেবল পরিচয়ের বিষয় নয়; এটি কর্তৃত্ব, আত্মবিশ্বাস ও জনমানসে পুলিশের গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

গবেষণার ঘাটতি: 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুমাইয়া ইকবাল পুলিশের পোশাক নির্ধারণের বিষয়ে পত্রিকাকে বলেন বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইউনিফর্ম নির্ধারণ একটি গবেষণাভিত্তিক ও তথ্যনির্ভর প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। কিন্তু দেশে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব রয়েছে, যার ফলে সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউনিফর্ম নির্ধারণে জলবায়ু, দৃশ্যমানতা, অপারেশনাল সুবিধা ও জনমনে প্রভাব—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

সামাজিক প্রতিক্রিয়া: 

নতুন ইউনিফর্ম চালুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ও বিদ্রূপ দেখা গেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, পুলিশের পোশাক এমন হওয়া উচিত যা তাদের আলাদা পরিচিতি, কর্তৃত্ব ও আস্থা প্রতিফলিত করে। 

পুলিশ ইউনিফর্ম ইস্যু এখন আর কেবল বাহ্যিক পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতিগত মানদণ্ড, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বাহিনীর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতামত, মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ভিত্তি করে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত না এলে এই বিতর্ক আরও গভীর হতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইউনিফর্ম পুনর্নির্ধারণ শুধু একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়—বরং এটি পুলিশের পেশাগত মর্যাদা ও জননিরাপত্তা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।