পর্দার আড়ালে রাজনৈতিক নানা সমীকরণ

Shahrier Islam Pallab
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১০:০৪ অপরাহ্ন, ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১১:৪৩ অপরাহ্ন, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

নির্বাচিত সরকারের ছয় মাসের মধ্যেই রাজনীতির নানা সমীকরণ শুরু হয়েছে। মাঠের রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে আবারও ৯৫-৯৬ স্টাইলে সরকারবিরোধী অভিন্ন কর্মসূচির আভাস স্পষ্ট হয়েছে। আলোচনায় আসছে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গোপন আঁতাতের বিষয়টি। দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক খেলোয়াড়রা এখন অনেকটাই তৎপর—এমনটাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরও বিতর্কিত ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত অনেক সাবেক সেনা, কিছু সাবেক সেনা কর্মকর্তা, আমলা, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যোগদানের পাশাপাশি তাদের গোপন যোগাযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেই জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ‘সমঝোতা’র গুঞ্জনে প্রশ্ন উঠেছে, এর নেপথ্যে কী রাজনৈতিক আবারও সেই পুরনো সমীকরণ?

আরও পড়ুন: সৌদিতে হুথিদের হামলায় নিহত বাংলাদেশি

গত বৃহস্পতিবার ফেনীতে এক সমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত বিগত সরকারের অনুসারী ও একটি ‘গুপ্ত বাহিনী’ জনগণের কল্যাণে সরকারের কর্মসূচিগুলোকে বাধাগ্রস্ত করতে আবারও হাত মিলিয়েছে। দেশে অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ‘গুপ্ত রাজনীতি’ ও ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার সরকারের রাজনীতির বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, নির্বাচনের মাত্র সাত মাস যেতে না যেতেই জামায়াত ও এনসিপির লংমার্চ কর্মসূচি নিয়েও বিএনপি ক্ষুব্ধ। তাছাড়া সরকারের মেয়াদের এত অল্প সময়ের মধ্যে লংমার্চ কর্মসূচি নিয়ে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলেও নানা আলোচনা আছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এত কম সময়ের মধ্যে লংমার্চের মতো বড় কর্মসূচি দেওয়া হলে ভবিষ্যতে তারা আর কী ধরনের কর্মসূচি পালন করবে? তাছাড়া অব্যাহত কর্মসূচির কারণে নতুন করে দেশ অচল হয়ে পড়লে পরিস্থিতি কী দাঁড়াতে পারে, তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা।

আরও পড়ুন: আইএমএফের ঋণ নিয়ে সরকারের অবস্থান, আপত্তি যেসব শর্তে

এদিকে নানা ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছে জামায়াতসহ ১১ দল। বিশেষ করে বৈশ্বিক সমস্যা অর্থাৎ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে তেল-গ্যাসের সংকট দেখা দিলেও বিরোধী দল এ বিষয়ে সরকারকে ছাড় দিচ্ছে না। অথচ সমস্যাটি দেশের নয় বা সরকারের নয়। দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতিসহ অন্যান্য বিষয় নিয়েও কোনো ছাড় দিচ্ছে না বিরোধী দল। বিশ্লেষকদের ধারণা, এর পেছনে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত থাকতে পারে।

ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী মনে করেন, অশুভ আঁতাতকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তবে ক্ষমতাসীন দলকে অবশ্যই আরও সতর্ক ও কৌশলী হতে হবে। তিনি বলেন, যুদ্ধের সময়ও যেমন কৌশলগত সংলাপ চলে, সরকারকে ঠিক তেমনই বিরোধী দলের সঙ্গে সংসদীয় রীতিতে সমঝোতার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোকে সঙ্গে নিয়েই রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধনমূলক কাজগুলো সম্পন্ন করতে হবে। বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে নাগরিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি ব্যর্থ হলে জামায়াতে ইসলামী বা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ দেশে অরাজকতাই চাচ্ছে। অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রত্যাশা ছিল, সরকার ও বিরোধী দলগুলো পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে দায়িত্বশীল রাজনীতির চর্চা করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরুতে সে ধরনের বেশ কিছু ইতিবাচক উদাহরণও সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ নানা ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যকার দূরত্ব এখন সুস্পষ্ট।

যদিও বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সদ্ভাব বজায় রেখে চলার কথা বলছে বিএনপি। কিন্তু এখন পর্যন্ত দলগুলোর মধ্যে নতুন করে কোনো পারস্পরিক বৈঠক বা আলাপের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তবে বিএনপির একটি বড় অংশের মতে, সব রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং সমঝোতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনাই বর্তমান সরকারের জন্য টেকসই সুফল বয়ে আনবে।

ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী বলেন, একটি কার্যকর সংসদীয় গণতান্ত্রিক সমাজে সংসদেই বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনা করার কথা। সরকারের বয়স মাত্র ৬-৭ মাস হওয়ার পরেই রাজপথে নামার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সব ধরনের বিরোধ ও মতপার্থক্য জাতীয় সংসদে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব।

তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে জামায়াত আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে যে আন্দোলন করেছে, এবারও কোনো ছুতায় সরকারের বিরুদ্ধে তারা একত্রে আন্দোলন করতে পারে—এমন সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বর্তমানে বিরোধী দল যেভাবে আন্দোলন করছে, তা মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছে না। যেকোনো বিষয়ে আন্দোলন করার অধিকার তাদের রয়েছে। সেটি সংসদ কিংবা রাজপথে হতে পারে। কিন্তু সরকারের বয়স মাত্র ৮ মাস, এ সময় লংমার্চের মতো কর্মসূচি পালন করা ষড়যন্ত্র হতে পারে বলে মানুষ মনে করে।