ইসলামে ঈদ উৎসব ও ঈদের সুন্নাহ সমূহ
দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের ঘরে এলো ঈদ মোবারক। কবির ভাষায় ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ, আপনাকে আজ বিলিয়ে দে সব আসমানি তাগিদ। বাংলাদেশী মুসলমানদের ঘরে ঘরে সোমবার ঈদ উৎসব। এই ঈদে আমাদের কি করনীয় মুসলমানরা কিভাবে উৎসব পালন করবে তা জানার প্রয়োজন। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঈদ পালন দেখেই আমাদের পালন করা উচিত। হাদিসে ঈদ পালনের নির্দেশাবলী পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘প্রিয় নবী (সা.) মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আগমন করে দেখলেন, মদিনাবাসী খেলাধুলার মধ্য দিয়ে দুইটি দিবস উদযাপন করে থাকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ দুইটি কীসের দিবস? তারা বললেন, এ দুই দিবসে জাহেলি যুগে আমরা খেলাধুলার করে উদযাপন করতাম। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য এর থেকে উত্তম দুইটি দিবসের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। একটি হল, ঈদুল আজাহা এবং অপরটি হল, ঈদুল ফিতর।’ (আবু দাউদ, হাদিস নং: ৯৫৯)।
আরও পড়ুন: চাঁদ দেখা গেছে, কাল ঈদুল ফিতর
‘ঈদ’ শব্দের আরবি শব্দমূল ‘আউদ’। ঈদ অর্থ যা ফিরে ফিরে আসে। ‘ফিতর’ শব্দের অর্থ ভেঙে দেওয়া বা ইফতার (নাস্তা) করা। ঈদুল ফিতর মানে সে আনন্দঘন উৎসব; যা দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আসে। আসে সুশৃঙ্খল আচার-আচরণের তীর ঘেঁষে। নৈতিক, আত্মিক ও সামাজিক পরিশুদ্ধির সীমানা পেরিয়ে সামষ্টিক কল্যাণ নিয়ে ঈদ আসে। ঈদ আসে কৃচ্ছ্র ও শুদ্ধতার প্রতীক হয়ে। তাকওয়ার (আল্লাহভীতি) শক্তিতে বলীয়ান হয়ে নতুন জীবনে ফেরার অঙ্গীকার নিয়ে ঈদ আসে।আর আল্লাহপাকের খাস রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত লাভের এক মাস সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে যে ঈদ আসে, তা হলো ঈদুল ফিতর। একজন রোজাদারের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলো খোদাতায়ালার আদেশ অনুযায়ী মাসব্যাপী রোজা রাখতে আল্লাহ তাকে তৌফিক দিয়েছেন। এ খুশি প্রকাশ করতেই রমজান মাস শেষ করে শাওয়াল মাসের ১ তারিখে ঈদের আনন্দে মিলিত হয়।
আর এই দিনটির মাধ্যমে আল্লাহপাক মুমিনের জন্য সব বৈধ খাবার ও পানীয় ও কাজকর্ম যা কি না রোজার কারণে বিরত রেখে ছিলেন তার অনুমতি প্রদানের জন্য। কাজী নজরুল ইসলামের একটি বিখ্যাত গান‘ও মন রমজানেরই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/ও তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন; আসমানি তাকিদ/তোর সোনাদানা বালাখানা সব রাহেলিল্লাহ/দে জাকাত মুর্দা মুসলিমে আজ ভাঙাইতে নিদ।’ প্রতি বছরই ঈদ আসে, ঈদ যায়। কিন্তু কাজী নজরুলের এ গানটি ছাড়া যেন আমাদের ঈদই জমে না। প্রতি বছরই এ গানটি ঈদের আগের দিন বাঙালি মুসলিমদের অন্তরে জেগে ওঠে। ঈদ কি শুধু আনন্দ আর খুশির নাম? না, বরং ঈদ একটি ইবাদতও বটে।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে সৌদির সঙ্গে মিল রেখে ঈদুল ফিতরের নামাজ অনুষ্ঠিত
ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব : এ ঈদের নামাজ আদায় করা ওয়াজিব। যারা ঈদের নামাজ আদায় করে না তারা অবশ্যই গুনাহগার হবে। ঈদ আসে বিশ্ব মুসলিমের দ্বারপ্রান্তে বার্ষিক আনন্দের মহাবার্তা নিয়ে, আসে সীমাহীন প্রেম-প্রীতি বিলাবার সুযোগ নিয়ে, বিগত দিনের সকল ব্যথা বেদনা ভুলিয়ে দিতে, কল্যাণ ও শান্তির সওগাত নিয়ে। বছরে দু’দিন ঈদের নামাজের মাধ্যমে মহান আল্লাহ মুসলমানদের জন্য যে মহাসম্মেলনের ব্যবস্থা করেছেন তার মধ্যে রয়েছে ইসলামী সমাজ কায়েমের প্রেরণা। সমাজকে কলুষ কালিমা মুক্ত করার জজবা, মানবতা ও মনুষ্যত্ব বিকাশের এক বিশেষ অনুশীলন।
ঈদুল ফিতরের ফজিলত : ঈদুল ফিতরের দিনের বহুত ফজিলত রয়েছে। যারা ঈদের দিন যথারীতি ঈদগাহে গিয়ে যথানিয়মে ঈদের নামাজ আদায় করে মহান আল্লাহ তাদের দুআ কবুল করেন এবং তাদের অফুরন্ত পুরস্কার দানে ধন্য করেন। হাদিসে এসেছে, যারা ঈদের নামাজ আদায় করার জন্য ঈদের ময়দানে একত্র হয়, আল্লাহ তায়ালা তাদের সম্পর্কে ফেরেশতাদের ডেকে জিজ্ঞেস করেন যারা স্বেচ্ছায় দায়িত্ব পালন করে আজ এখানে সমবেত হয়েছে তাদের কী প্রতিদান দেয়া উচিত? ফেরেশতারা বলেন, পুণ্যময় কাজের পুরোপুরি পারিশ্রমিক দেয়াই উচিত। তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁর ইজ্জতের শপথ করে বলেন, অবশ্যই তিনি তারে প্রার্থনা মঞ্জুর করবেন। এরপর আল্লাহ তায়ালা ঈদের নামাজ সমাপনকারী তাঁর নেক বান্দাদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন, ‘আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি এবং তোমাদের কৃত অতীত পাপকে সওয়াবে পরিণত করে দিলাম’ এ পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নামাজ সমাপনকারীগণ ঈদের মাঠ থেকে এমন অবস্থায় স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করলো যেন নিষ্পাপ শিশু।’
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি পুনণ্য লাভের আশায় দু’ ঈদের রাত জেগে ইবাদত করে সেদিন (কিয়ামতের দিন) তার অন্তর এতটুকু ভীত-সন্ত্রস্ত হবে না যেদিন অন্যদের অন্তর ভীত-বিহ্বল অবস্থায় মৃতবৎ হয়ে পড়বে। মহান আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে রোযাদারদের জন্য বিশেষ একটি পুরুস্কার হচ্ছে, ‘ঈদুল ফিতর’ । আর ঈদের তাৎপর্য অপরিসীম । মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. হাদিসে ইরশাদ করেন , ‘ঈদুল ফিতরের দিন যখন আসে তখন আল্লাহ তা’আলা রোযাদাদের পক্ষে গর্ব করে ফেরেশতাদেরকে বলেন, হে আমার ফেরেশতাগণ তোমরাই বলো রোযাদারেদের রোযার বিনিময়ে আজকের এই দিন কি প্রতিদান দেয়া যেতে পারে ? সেই সমস্ত রোযাদার যারা তাদের দায়িত্ব পুরোপুরী আদায় করেছে, তখন ফেরেশতারা আল্লাহকে বলেন, তে দয়াময় আল্লাহ উপযুক্ত উত্তম প্রতিদান তাদের দান করুন । কারণ তারা দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা করেছেন, প্রাপ্য পারিশ্রমিক তাদেরকে দান করুন ।
তখন আল্লাহ তা’আলা রোযাদারদেরকে বলতে থাকেন, ‘হে আমার বান্দা তোমরা যারা যথাযথভাবে রোযা পালন করেছ, তারাবীহর নামাজ পড়েছ, তোমরা তাড়াতাড়ি ঈদগাহে মাঠে ঈদের নামাজ পড়ার জন্য যাও এবং তোমরা তোমাতের প্রতিদান গ্রহণ করো । ঈদের নমাজের শেষে আল্লাহ তা’আলা তার বান্দাদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন, হে আমার প্রিয় বান্দারা আমি আজকের এ দিনে তোমাদের সকল পাপগুলোকে পূর্ণের দ্বারা পরিবর্তন করে দিলাম । অতএব তোমরা নিস্পাপ হয়ে বাড়িতে ফিরে যাও’। বাইহাকী ও মিশকাত শরীফ । মহানবী সা. ইরশাদ করেন, ‘ঈদের আনন্দ শুধু তাদের জন্য যারা রমযানের রোযা তারাবিহর নামাজসহ আল্লাহ তা’আলার যাবতীয় বিধি-বিধান গুরুত্ব সহকারে আদায় করেছে । আর যারা রমযানের রোযা ও তারাবীহ আদায় করেনি তাদের জন্য ঈদের আনন্দ নেই, বরং তাদের জন্য ঈদ তথা আনন্দ অগ্নিশিখা সমতুল্য। (বুখারী শরীফ। রাসূল সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি পুণ্যময় ৫টি রাতে ইবাদত-বন্দেগী করে সেই ব্যক্তির জন্য সু-সংবাদ রয়েছে, আর সেই সুসংবাদটি হচ্ছে ‘জান্নাত’ এবং পুণ্যময় ৫টি রাত হলো ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, লাইলাতুলকদর, জ্বিলহজ্জের রাত, আরাফাতের রাত । [বাইহাকী ] এছাড়াও ঈদের অনেক গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে ।
ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় সুন্নত : জুবাইর ইবনু নুফাইর (রা.) বর্ণিত, তিনি বলেন- নবীজী (সা.)-এর সাহাবোয়ে কেরাম ঈদের দিন পরস্পর সাক্ষাৎ হলে বলতেন ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়ামিন কুম’ অর্থাৎ আল্লাহ আমার ও আপনার যাবতীয় ভাল কাজ কবুল করুক। (ফাতহুল ক্বাদির, ২খন্ড, ৫১৭)। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, পাড়া-পড়শী, ও গরীব-দুঃখীদের খুঁজ-খবর নেওয়া ও তাদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা ঈদের দিনের অন্যতম আমল। আনন্দ-বিনোদনের নামে কেউ যেন ইসলামী শরিয়ত পরিপন্থী কাজে লিপ্ত না হয়, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
ঈদের সুন্নাতসমূহ: ঈদের দিন পরিষ্কার পরিচ্চন্ন হওয়া, মিসওয়াক করা, গোসল করা সুন্নাত। আতর ইত্যাদি সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নাত। ক্স সাজ সকালে ইদগাহে গমন করা সুন্নাত। ক্স সুন্দর ও উত্তম কাপড় পরিধান করা সুন্নাত। ক্স ঈদুল ফিতরের নামাযের জন্য ঈদগাহে বা মসজিদে যাওয়ার পূর্বে বেজোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়া (বা কোন মিষ্টি দ্রব্য খাওয়া) সুন্নাত। (বুখারী/৮৯৯)। ঈদগাহে যাওয়ার সময় এক পথে যাওয়া এবং আসার সময় ভিন্ন পথে আসা সুন্নাত। (বুখারী/৯২৯)। ঈদের নামাযের জন্য পায়ে হেঁটে যাতায়াত করা সুন্নাত। (ইবনে মাজা : ১০৭১)। ঈদগাহে আসা-যাওয়ার সময় তাকবীর বলা সুন্নাত। ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’ বলে ঈদের মোবারকবাদ প্রদান করা সুন্নাত। ঈদের নামায ঈদের নামায বসতির বাইরে খোলা মাঠে ঈদগাহে পড়া সুন্নাত। (মুসলিম/১৯২৬)। ঈদের নামাযের জন্য মহিলারাও ঈদগাহে আসতে পারে। (মুসলিম/১৯২৬)।
পরিশেষে, ঈদের আনন্দকে পরিশুদ্ধ করার জন্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আনন্দ দান করার জন্য ইসলাম ধনীদের ওপর ওয়াজিব করেছে সদকাতুল ফিতর। সদকায়ে ফিতরের অন্তর্নিহিত রহস্য ও তাৎপর্য হলো, ঈদের আনন্দে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকেও শামিল করে নেয়া। আরো একটি রহস্য হচ্ছে, সদকাতুল ফিতর রোজার জাকাতস্বরূপ। জাকাত যেমনি সম্পদকে পরিশুদ্ধ করে তেমনি সদকাতুল ফিতর রোজাকে শুদ্ধতা দান করে। রোজার ক্রটি-বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ করে। ফিতরা ওয়াজিব হয় ঈদের দিন সুবহে সাদেক থেকে।আর মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে প্রার্থনা করি, সকল মুসলিমের ঈদ হোক আনন্দের। ঈদ হোক পুণ্যের।





