নৌকায় জন্ম, নৌকাতেই মৃত্যু, মাঝে ভাসমান জীবন
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের চান্দার খাল এলাকায় নদীর বুকজুড়ে সারিবদ্ধ ভাসমান নৌকার দৃশ্য যেন জেলে পরিবার গুলোর ভিন্ন বাস্তবতার এক নির্মম চিত্র । প্রায় ৫০টি জেলে পরিবার বছরের পর বছর ধরে এখানে নৌকাকেই ঘর বানিয়ে নিঃশব্দে বেঁচে আছেন অমানবিক দুঃখ কষ্ট সহ্য করে। নৌকার ভেতরই চলছে তাদের রান্না, ঘুম, সন্তানদের হাসি- কান্না,খেলাধুলা, জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত । জীবন যেন নদীর স্রোতের মতো ভাসমান, অনিশ্চিত আর প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ অমানবিক জীবনযাপন যাদের নিত্য দিনের সাথী।
জোয়ার-ভাটার সঙ্গে শুধু নদীর পানি নয়,বদলায় তাদের ভাগ্যও। কখনো মাছ পেলে দু’বেলা খাবার জোটে, কখনো খালি হাতে ফিরতে হয় তীরে। নদীভাঙন, দুর্যোগ, দারিদ্র্য , রোগ আর অবহেলা তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: সোনাগাজীতে বীরমুক্তিযোদ্ধার বিধবার জমি দখল করে ঘর নির্মাণের অভিযোগ
চান্দার খালের এ অঞ্চলে বৃষ্টি হলে নৌকার মধ্যে পানি ঢুকে পড়ে , শীতে কাঁপতে হয়, গরমে দম বন্ধ হয়ে আসে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে নারী ও শিশুরা । একেক রাতে নদীর স্রোত এতটাই ভয়ংকর হয়ে ওঠে যে পুরো রাত জেগে থাকতে হয় তাদের সকলকে।
নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তাল মিলিয়েই ওঠানামা করে তাদের ভাগ্য। কখনও খাবার আছে, কখনও নেই। ঝড়-জলের ভয়, নদীভাঙনের আতঙ্ক আর অভাবের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে এই মানুষগুলো ।
আরও পড়ুন: দড়ি ধরে মসজিদে যাওয়া অন্ধ মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান মারা গেছেন
জেলে নারী সালেহা বেগম বলেন, “সকালে পান্তা ভাত খাইছি। রাতে আল্লাহ যদি খাওয়ায় তবেই খেতে পারবো। স্বামী-স্ত্রী দুইজনে নদীতে মাছ ধরি, কিন্তু সবসময় মাছ পাই না। আমাদের কোন স্থায়ী কোন ঘরবাড়ি নাই - মরলে কবর দেওয়ার মতো কোন জায়গাও আমাদের নাই। আমাদের সন্তানের জন্ম হয় নৌকাতে - আর মৃত্যুও হয় নৌকাতে ”।
সরজমিনে গিয়ে জানা যায়, ঘরহারা মানুষগুলো বাধ্য হয়েই নৌকাকে স্থায়ী ঠিকানা করেছেন। গরমে দমবন্ধ হয়ে যাওয়া , বৃষ্টিতে পানিতে ভিজে যাওয়া , শীতে হাড়কাঁপানো অসহনীয় ঠান্ডা—প্রতিটি ঋতুই যেন তাদের নতুন শত্রু।বয়স্ক জেলে রহিম উদ্দিন বলেন, “এই নদী আমাদের বন্ধু, এই নদী আবার আমাদের শত্রু। কখনো মাছ দেয়, আবার কখনো খালি হাতে তীরে ফিরিয়ে আনে। শেষ ঠিকানা এবং সম্বল আমাদের নৌকা ছাড়া আমাদের আর কিছু নাই কোন জায়গা নাই ।
শিশুদের নৌকায় বই-খাতা নিয়ে লেখা পড়া করা অনেক কঠিন। স্কুলে ভর্তি হলেও যাতায়াত ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অধিকাংশ শিশুই স্কুলমুখী হয় না। সাধারণ জ্বর, সর্দি, ডায়রিয়া—সবই বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায়।জেলে মোহাম্মদ আনোয়ার সরদার বলেন, “নদীতেই আমাদের বাচ্চারা জন্ম নেয়, নদীতেই বড় হয়। সারা বছরই সংগ্রাম করে। বর্ষা এলে সেই কষ্ট আরও দ্বিগুণ বেড়ে যায় ।
জেলে মোহাম্মদ আলী সরদার বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা তো দূরের কথা, জ্বর, সর্দি, ডায়রিয়ার মতো সাধারণ রোগেই প্রায়ই আমরা অসহায় হয়ে পড়ি । নদীতে জন্ম নেয়া আমাদের শিশু গুলো , নদীতেই বড় হয়। সারা বছরই আমাদের জীবনটা সংগ্রামের, আর বর্ষা মৌসুম মানেই আমাদের জন্য ভয়াবহ দিন যা বলে বুঝাতে পারবো না আপনাদের ।
প্রবীণ জেলে সালাউদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ৬৬ বছর নদীতেই আছি। কেউ খোঁজ নেয় না। বৃষ্টিতে ভিজি, রোদে শুকাই,আমরা কি মানুষ না? আমাদের কষ্ট দেখার কি কেউ নাই?
এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন মিয়া বলেন, চান্দার খালের মানুষের এই হাহাকার শুধুই অভাবের গল্প নয়, এটি একটি অধিকারবঞ্চিত জাতিগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বেদনা আর কষ্টের চিত্র। যা সমাজের সামনে বারবার ফিরে আসে, কিন্তু সমাধান হয় না। একটি টেকসই আশ্রয়, নিয়মিত খাদ্য নিরাপত্তা, শিশুদের শিক্ষা আর চিকিৎসা এগুলোই তাদের প্রধান চাওয়া। ভাসমান জীবনে তারা চায় একটু স্থিরতা, একটু নিরাপদ ভবিষ্যৎ জীবনের নিশ্চয়তা ।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার রাশেদ হাসান বলেন, ‘চান্দার খাল এলাকায় নৌকায় বসবাসকারী পরিবারের বেশিরভাগই প্রকৃত জেলে। তাদের জীবিকা অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আমরা ইতোমধ্যে তালিকা প্রস্তুত করছি। যাদের এখনও জেলে কার্ড নেই, তাদের দ্রুত জেলে কার্ড প্রদান করা হবে। এতে সরকারি বিভিন্ন সুবিধা যেমন ভিজিডি চাল, মৎস্য অধিদপ্তরের সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহযোগিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আমরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছি যাতে এই পরিবারগুলো আর বঞ্চিত না থাকে।’ তিনি আরও বলেন, নদীভাঙন এবং বাসস্থান সংকটের বিষয়টিও আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে উপস্থাপন করব। জেলে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে সরকার সব সময় আন্তরিক এবং এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান কাউছার গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, “নৌকায় বসবাসকারঅমানবিক জীবনযাপন ও দুর্দশা আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। যাদের ঘর নেই, তাদের পুনর্বাসন ও নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আনতে কাজ চলছে। শিশুদের শিক্ষার জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সব দপ্তরকে নিয়ে আমরা একটি স্থায়ী সমাধান যাতে হয় তার জন্য কাজ করে যাচ্ছি ।





