গাজীপুরকে নিরাপদ করতে সেফ সিটি প্রকল্প, নজরদারিতে এআই

Any Akter
গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৫:২১ অপরাহ্ন, ১৪ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৬:৩৪ অপরাহ্ন, ১৪ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

জননিরাপত্তা সুসংহত করা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত পুলিশি সেবা নিশ্চিত করতে গাজীপুর মহানগরীকে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ‘সেফ সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গাজীপুর মহানগর পুলিশ (জিএমপি), গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন (জিসিসি) এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় পুরো মহানগরকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আইপি ক্যামেরা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডাটা অ্যানালিটিক্স এবং স্মার্ট মনিটরিং প্রযুক্তির নিশ্ছিদ্র নজরদারিতে আনা হচ্ছে।  জিএমপি সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে অনুমোদন নিয়ে বর্তমানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে অর্থ বরাদ্ধ ও প্রশাসনিক অনুমোদানের অপেক্ষায় রয়েছে। 

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরে বাস্তবায়িত এই পাইলট প্রকল্প সফল হলে পরবর্তী সময়ে রাজধানী ঢাকায় একই ধরনের ‘সেফ সিটি’ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

আরও পড়ুন: ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও অভিনয় শিল্পী সংঘের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক স্বাস্থ্য চুক্তি

সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার অবাস্তব বা কাল্পনিক ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর স্লোগানে বিশ্বাসী না হয়ে সরাসরি বাস্তবমুখী এবং টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহী। যথাযথ অবকাঠামো ও আর্থসামাজিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার অংশ হিসেবেই রাজধানী ঢাকাকে সেফ সিটি হিসাবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ জন্য  ‘Development of Safe City in Dhaka’ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। প্রকল্পের টেকনিক্যাল সাব-কমিটির পঞ্চম সভা গত ৫ জুন ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ পুলিশের ডিআইজি (ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট) মো. মুশফেকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় জানানো হয়, 

রাজধানীর তুলনায় কম বাজেট এবং অত্যন্ত সহজতর ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য প্রক্রিয়ার কারণে গাজীপুর মহানগরীতে এই প্রকল্প সর্বাগ্রে কার্যকর করা সম্ভব। এ জন্য ঢাকার আগে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) ও নারায়ণগঞ্জকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি’ (IIFC) এবং স্থানীয় পুলিশের যৌথ সমন্বয়ে সফলভাবে ফিজিবিলিটি স্টাডি ও জিওলোকেশন সার্ভে সম্পন্ন হয়েছে। পাইলট প্রকল্পের সফলতার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তীতে তা রাজধানী ঢাকায় সম্প্রসারণ করা হবে।

আরও পড়ুন: নরসিংদীতে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেল অস্ত্র ও গুলি


সূত্র আরো জানায়, প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের আওতায় পুরো মহানগরীকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হবে। কারিগরি দিক থেকে এই প্রকল্পে ফেস রিকগনিশন (FR) ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে-যা সন্দেহভাজন বা চিহ্নিত অপরাধীদের চেহারা দ্রুত শনাক্ত করতে সক্ষম এবং তাৎক্ষণিক অ্যালার্ম প্রদান করবে। অটোমেটিক নাম্বার প্লেট রিকগনিশন (ANPR) ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে-যা যানবাহনের নম্বরপ্লেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও ট্র্যাক করবে এবং ট্র্যাকিং নিশ্চিত করা। এছাড়া, কেন্দ্রীয় কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার থাকবে, যেখান থেকে পুরো মহানগরের নিরাপত্তা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে। এআই ভিত্তিক ভিডিও ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও অ্যালার্ম সিস্টেম থাকবে, যা ভিডিও বিশ্লেষণের মাধ্যমে অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক কার্যকলাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম ব্যবস্থা চালু করবে। এরফলে পুলিশ রেসপন্স ইকোসিস্টেম চালুর মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পুলিশি প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টারের মাধ্যমে পুরো মহানগরীর সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং রিয়েল-টাইম সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে পুলিশি সেবা পৌঁছানো সম্ভব হবে।


সূত্র আরো জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিশ্বের নামকরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ প্রকাশ করেছে। টেকনিক্যাল সাব-কমিটির সভায় এইচকে ভিশন (HK Vision), হুয়াওয়ে (Huawei), ডাহুয়া (Dahua), এনইসি (NEC), মটোরোলা (Motorola) এবং ইউনিভিউ (UniView)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কারিগরি সক্ষমতা প্রদর্শন (Presentation) করেছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের প্রস্তাবিত প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য ‘প্রুফ অফ কনসেপ্ট’ (POC) জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের প্রস্তাবিত প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য প্রুফ অব কনসেপ্ট (POC) জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ওই সভায় জানানো হয়, বর্তমান সময়ের বাস্তবতা ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (DPP) পুনর্মূল্যায়নের কাজ চলছে। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত কারিগরি কমিটি সিস্টেম আর্কিটেকচার, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং ইকুইপমেন্ট তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ করছেন।

সূত্র আরো জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি), বিআরটি (BRT) এবং আইইউটি (IUT) সহ বিভিন্ন অংশীজন নিবিড়ভাবে কাজ করছে। এ জন্য জিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) মো: তাহেরুল হক চৌহান স্থানীয় কমিউনিটি ও অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে এবং সরেজমিনে প্রয়োজনীয় ফিজিবিলিটি স্টাডি ও জিওলোকেশন সার্ভে কাজ সম্পন্ন করেছেন। সে অনুযায়ী গাজীপুর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্ধের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রাণয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনুমোদর দিলে অচিরেই প্রকল্পটি গাজীপুর মহানগরীতে বাস্তবায়ন শুরু হবে। এ জন্য জিএমপি সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

এ বিষয়ে গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোঃ তাহেরুল হক চৌহান বলেন, "আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে গাজীপুর মহানগরীতে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ, শ্রমিক এবং শিল্পপতিদের সম্পদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাজধানীর অত্যন্ত কাছে অবস্থিত গাজীপুর দেশের একটি অন্যতম অর্থনৈতিক হাব। এখানে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের বাস। যেখানে প্রায় ২০ লক্ষ কর্মজীবী মানুষের রুজি-রুটি জড়িয়ে রয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তাগণ যাতে নিরাপদে তাদের উৎপাদন সচল রাখতে পারেন এবং শ্রমিকরা যাতে নির্ভয়ে কর্মস্থলে যাতায়াত করতে পারেন, ‘সেফ সিটি’ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা সেই নিরাপদ নগরী গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"

বিষয়টিকে সরকারের একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও জনবান্ধব কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি। তিনি বলেন, "বর্তমান সরকার দেশ ও মানুষের কল্যাণে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি নিয়ে কাজ করছে। বর্তমান সরকার প্রধান জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে মানুষের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও সুশাসন নিশ্চিত করাই আমাদের অগ্রাধিকার। সবার আগে বাংলাদেশ গঠনে আইন-শৃঙ্খলার আধুনিকায়ন ও মানুষের নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি গাজীপুরবাসী খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই আধুনিক সেফ সিটির সুবিধা লাভ করবেন এবং সকলে দেশ গঠনে যার যার জায়গা থেকে কাজ করবেন।"

এটি বাস্তবায়িত হলে গাজীপুর হবে দেশের প্রথম আধুনিক ও নিরাপদ শিল্পনগরী।