সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২২ শিশুর মৃত্যু
- টিকাবঞ্চিত শিশুদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি, সতর্ক করলো ইউনিসেফ। হাম ছাড়াও জটিল কো মরবিডিটির ভয়াবহ আক্রান্ত শিশুরা
হাম কি শুধুই একটি সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ, নাকি বড় কোনো বিপদের আগাম বার্তা। রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের (আইডিএইচ) বর্তমান চিত্র বলছে এক ভয়াবহ আশঙ্কার কথা। গত তিন মাসে হাসপাতালটিতে ২২টি শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে, তবে এর নেপথ্যে শুধু ‘হাম’ নয়, বরং ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিভিন্ন জটিল ‘সহ-রোগ’ বা কো-মরবিডিটি। তবে চিকিৎসকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তথ্য মিলেছে, যেসব শিশু হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা জন্মগত হৃদরোগে ভুগছে, তাদের জন্য এই সংক্রমণ প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে টিকা না পাওয়া ৩ থেকে ১০ মাস বয়সী শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। একদিকে রোগীর চাপে হাসপাতালের শয্যা ছাড়িয়ে বারান্দা-মেঝেতে ঠাঁই হচ্ছে অসুস্থ শিশুদের, অন্যদিকে একই ওয়ার্ডে বিভিন্ন সংক্রামক রোগীর একত্রে অবস্থান তৈরি করছে এক চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি।
হাসপাতালটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হামের রোগীর প্রচণ্ড চাপে চিকেন পক্স ও নিউমোনিয়ার জন্য বরাদ্দ দেওয়া ওয়ার্ডেও হামের রোগীদের রাখা হয়েছে। এতে একে অন্যের মাধ্যমে নতুন করে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, হামের রোগীদের জন্য মাত্র আটটি শয্যা বরাদ্দ থাকলেও বর্তমানে রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। শয্যা না থাকায় অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন: দেশে হঠাৎ করেই হাম ছড়াচ্ছে কিভাবে
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ৮৬ জন হামের রোগী ভর্তি আছেন, যার মধ্যে ১২ জন আইসিইউতে। গত জানুয়ারি মাসে ২৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছিল। তবে, ফেব্রুয়ারিতে এসে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৮ জনে। চলতি মার্চের ৩০ তারিখ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ভর্তি হয়েছেন ৪৫৫ জন। জানুয়ারি মাসে কোনো মৃত্যুর ঘটনা না থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে একজন এবং মার্চ মাসে এখন পর্যন্ত ২২ জন মারা গেছে। হাসপাতালটির জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. শ্রীবাস পাল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, গত তিন মাসে আমাদের এখানে যে ২২টি শিশু মারা গেছে, তাদের অধিকাংশের বয়স ৩ থেকে ১০ মাসের মধ্যে। এই বয়সের শিশুরা হামের কোনো টিকা না পাওয়ায় তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। আমাদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মৃত শিশুদের প্রায় সবারই হামের সঙ্গে গুরুতর নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা চোখের প্রদাহ ছিল। অনেকেরই আগে থেকে হৃদরোগ বা কিডনি জটিলতা ছিল। শুধু হামের কারণে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়েছে— এমন রোগী আমরা পাইনি। হামের লক্ষণ সম্পর্কে ডা. শ্রীবাস পাল বলেন, প্রথম তিন-চার দিন জ্বর, শরীর ব্যথা, সর্দি ও কাশির মতো সাধারণ উপসর্গ থাকে। এরপর চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ দেখা দেয়। বিশেষ করে মুখের ভেতরে ‘কপলিক স্পট’ দেখে হাম শনাক্ত করা যায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে। শরীরে র্যাশ বের হওয়ার এক সপ্তাহ আগে থেকেই শিশুটি হাম ছড়াতে থাকে, যা নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন। তবে, হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে পক্স, নিউমোনিয়া ও হামের রোগীদের একত্রে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। একাধিক সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের একই স্থানে রেখে চিকিৎসা দেওয়ায় প্রত্যেকেই চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এ বিষয়ে ওই ওয়ার্ডে দায়িত্বরত চিকিৎসক ও নার্সদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, আমাদের আসলে কিছু করার নেই। কক্ষটি অন্যান্য সংক্রামক রোগীর জন্য বরাদ্দ থাকলেও বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে হামে আক্রান্ত রোগীদের যেভাবে এখানে পাঠানো হচ্ছে, তাতে বাধ্য হয়েই সবাইকে একত্রে রাখতে হচ্ছে। হামে আক্রান্ত রোগীদের আসামাত্রই অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ে, তাই জীবন বাঁচাতে দ্রুত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
গাজীপুরের টঙ্গী থেকে পাঁচ মাস বয়সী মিনহাজকে নিয়ে গত রাতেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মা মনি আক্তার। হাসপাতালে কোনো শয্যা (বেড) খালি না থাকায় বাধ্য হয়ে অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে মেঝেতেই আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। মনি আক্তার জানান, গত চার দিন ধরে তীব্র জ্বরের পাশাপাশি মিনহাজের মুখে হালকা লাল দাগ দেখা দেয়। প্রথমে অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ানো হলেও পরে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসেন তিনি। কিন্তু মেঝেতে ধুলোবালি আর মানুষের চলাচলের কারণে অসুস্থ শিশুটির অবর্ণনীয় কষ্ট হচ্ছে। মিনহাজের পাশেই মেঝেতে চিকেন পক্সের চিকিৎসা নিচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা ১৬ বছর বয়সী মাহিন। ১৪ দিন ধরে পক্সে ভুগছে সে। শয্যা না পেয়ে তাকেও মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। মাহিনের মা জানান, প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে ভর্তি না রাখায় এ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছেলের সুচিকিৎসার জন্য শত কষ্ট সহ্য করেও এখানে পড়ে আছেন তারা। শুধু মিনহাজ বা মাহিনই নয়, একই ওয়ার্ডে ভোলার বোরহানউদ্দিন থেকে আসা মরিয়ম (হামে আক্রান্ত) এবং নরসিংদী থেকে আসা আট বছর বয়সী জেসিকাও (চিকেন পক্সে আক্রান্ত) চিকিৎসা নিচ্ছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, ভিন্ন ভিন্ন সংক্রামক ব্যাধির রোগীদের এভাবে একত্রে রাখলে যেকোনো মুহূর্তে একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে নতুন সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার চরম ঝুঁকি রয়েছে। তবে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. তানজিনা জাহানের কাছে জানতে চাইলে তিনি ডা. শ্রীবাস পালের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
আরও পড়ুন: টিকাবঞ্চিত শিশু নিয়ে বিভ্রান্তি: পুরোনো তথ্য ব্যবহারে সতর্ক করল ইউনিসেফ
এদিকে, সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী হার বিবেচনা করে দুপুরে জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপের (নাইট্যাগ) এক পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, নিয়মিত কর্মসূচির বাইরে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ছয় মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হবে।
হামে আক্রান্ত হয়ে ৩৮ শিশুর মৃত্যু, জামায়াতের উদ্বেগ: দেশে হাম আক্রান্ত হয়ে চলতি বছর ৩৮ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের দুর্বলতা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়তে ইসলামী। সোমবার এক বিবৃতিতে এই উদ্বেগ ব্যক্ত করেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সিনিয়র প্রচার-সহকারী মুজিবুল আলমের পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, চলতি মার্চ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে বিভিন্ন জেলা ও বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য যোগ করলে এ বছর মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৪৬ বা তারও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। গোলাম পরওয়ার বলেন, এই পরিস্থিতির জন্য দেশের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনাই প্রধানত দায়ী। জনগণের ধারণা, স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের সুচিকিৎসা পাওয়ার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় হাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। টিকাবঞ্চিত শিশুদের বিভ্রান্তি, সতর্ক করলো ইউনিসেফ: বাংলাদেশে টিকাবঞ্চিত শিশুদের সংখ্যা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে ঘিরে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে সতর্কবার্তা দিয়েছে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষাসহ শিশুদের সার্বিক কল্যাণ, জীবনমান উন্নয়নে বিশ্বজুড়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ইউনিসেফ। সংস্থাটি বলছে, যেসব তথ্যকে বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেগুলো আসলে এক বছর আগের একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে নেওয়া। ফলে এগুলো দেশের বিদ্যমান টিকাদান পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মঙ্গলবার এক বার্তায় ইউনিসেফ জানিয়েছে,বাংলাদেশে শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং এ খাতে অগ্রগতি ধরে রাখতে সরকার ও অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। বার্তায় বলা হয়েছে, ইউনিসেফের লক্ষ্য- প্রতিটি শিশুকে জীবনরক্ষাকারী টিকার আওতায় নিয়ে আসা। এ বিষয়ে সঠিক ও হালনাগাদ তথ্য নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে উৎস ও সময়কাল যাচাই করে সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ।





