‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের ফরম বিতরণে সিইসির সংশ্লিষ্টতা নেই’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান ইসির
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথের ফরম বিতরণ করেছেন—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের এমন অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংবিধান লঙ্ঘন ও শপথ ভঙ্গের অভিযোগকে “ভিত্তিহীন” দাবি করে ইসি বলছে, শপথ ফরম বিতরণের সঙ্গে কমিশনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বিষয়টি ঘিরে সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা, প্রক্রিয়াগত বৈধতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
জাতীয় সংসদে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ নিয়ে আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবিধানের বাইরে গিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ফরম বিতরণ করেছেন, যা শপথ ভঙ্গ এবং সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল।
আরও পড়ুন: এমপি গিয়াস কাদের চৌধুরীর দুই ছেলেসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা
তিনি বলেন, সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সিইসি সংবিধান রক্ষার শপথ নিলেও বাস্তবে তিনি সেই শপথের পরিপন্থী কাজ করেছেন। “কোন আইনের বলে তিনি এই ফরম জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে পাঠালেন—তা স্পষ্ট নয়,”—প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তবে নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বাংলাবাজার পত্রিকা কে বলেন, “সংসদ সদস্যদের শপথের জন্য কোনো ফরম নির্বাচন কমিশন থেকে সরবরাহ করা হয়নি। সিইসি কেবল শপথ পড়িয়েছেন। কমিশন কেবল মনোনয়নপত্র বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে, শপথ ফরম বিতরণের সঙ্গে নয়।”
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় শাহজালাল বিমানবন্দরে এক মাসে ৮৯৪ ফ্লাইট বাতিল
তিনি আরও উল্লেখ করেন, শপথ অনুষ্ঠানে তিনি নিজেও উপস্থিত ছিলেন এবং সেখানে সিইসির পক্ষ থেকে কোনো অতিরিক্ত বা পৃথক ফরম বিতরণের ঘটনা ঘটেনি।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের একজন সদস্যও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বাংলাবাজার পত্রিকা কে বলেন, “আইন ও সংবিধান রক্ষার স্বার্থেই সিইসিকে দিয়ে শপথ পড়ানো হয়েছে। ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-সংক্রান্ত কোনো ফরম কমিশন থেকে বিতরণ করা হয়নি।” তবে, এ প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ( সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগের বিরুদ্ধে সিইসি এখনও কোন বিবৃতি দেন নি।
দুটি ফরম বিতরণ ঘিরে বিতর্ক:
এদিকে ১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে দুটি পৃথক ফরম বিতরণের বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। একটি ছিল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের ফরম, অন্যটি ছিল ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের জন্য।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ দলীয় সংসদ সদস্যদের স্পষ্ট নির্দেশ দেন, তারা শুধুমাত্র সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন। কারণ, তারা সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত হয়েছেন, কোনো “সংবিধান সংস্কার পরিষদ”-এর সদস্য হিসেবে নয়।
তিনি যুক্তি দেন, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন হয়ে তৃতীয় তফশিলে এ ধরনের শপথের বিধান যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।
দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। পরবর্তীতে বিএনপির সংসদ সদস্যরা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং সেই অনুযায়ী শপথপত্রে স্বাক্ষর করেন।
আইনি অবস্থান ও পাল্টা যুক্তি:
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে দাবি করেন, নির্বাচন কমিশন সংসদ সদস্যদের নির্বাচনের জন্য একটি মাত্র ব্যালট সরবরাহ করেছিল, যেখানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য নির্বাচনের কোনো প্রশ্ন ছিল না। ফলে জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট সংসদ সদস্য হিসেবে সীমাবদ্ধ—কোনো “অস্তিত্বহীন পরিষদ”-এর সদস্য হিসেবে নয়।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, শপথের আনুষ্ঠানিকতা পরিচালনা করা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা—এই দুটি ভিন্ন বিষয়। শপথ ফরম বিতরণ সংসদ সচিবালয়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ, যার সঙ্গে কমিশনের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই।
বৃহত্তর সাংবিধানিক বিতর্ক:
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’-এর বৈধতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যে এই আদেশকে “অবৈধ” এবং “অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতারণার দলিল” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ এবং চতুর্থ তফশিলের বিধান উল্লেখ করে দাবি করেন, রাষ্ট্রপতির এমন কোনো ক্ষমতা নেই যার মাধ্যমে সংবিধানের কাঠামোগত পরিবর্তন বা নতুন কোনো পরিষদ গঠন করা যায়।
সিইসির বিরুদ্ধে শপথ ভঙ্গের অভিযোগ এবং তা ঘিরে নির্বাচন কমিশনের সরাসরি অস্বীকৃতি—এই দুই বিপরীত অবস্থান দেশের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিষয়টি এখন কেবল রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং আইনি ব্যাখ্যা, সাংবিধানিক সীমারেখা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে রূপ নিচ্ছে। পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও বিচারিক পদক্ষেপের ওপর।





