দেশে হঠাৎ করে কালেমা খচিত সাদাকালো পতাকার মিছিল করছে কারা

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৮:০০ অপরাহ্ন, ০৩ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৮:০০ অপরাহ্ন, ০৩ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে কালেমাখচিত সাদা ও কালো পতাকা নিয়ে মিছিল, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা এবং বিভিন্ন স্থানে পতাকা টানানোর ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ এটিকে ইসলামের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, আবার অনেকে এসব পতাকার নকশা ও ব্যবহারের ধরন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

সম্প্রতি মাদারীপুর শহরের মডেল মসজিদ এলাকায় আসরের নামাজের পর দেড় শতাধিক মুসল্লি কালেমাখচিত পতাকা হাতে মোটরসাইকেল র‍্যালি করেন। শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে সংক্ষিপ্ত সমাপনী অনুষ্ঠানে আয়োজকদের একজন দাবি করেন, এটি ‘মুসলমানদের পতাকা’।

আরও পড়ুন: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে শনিবার স্মরণসভা, প্রধান অতিথি তারেক রহমান

র‍্যালিতে অংশ নেওয়া একজন স্থানীয় ইমাম সাংবাদিকদের বলেন, ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিভিন্ন দেশের পতাকা টাঙানোর বিপরীতে মুসলমানদের পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে তারা এ কর্মসূচি পালন করেছেন।

তবে মাদারীপুরেই নয়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের পতাকা নিয়ে মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জনপরিসরে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।

আরও পড়ুন: আল্লামা সাঈদীর সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে অপহরণকারী সাবেক এএসপি গ্রেপ্তার

ইসলামে কি নির্দিষ্ট কোনো পতাকা আছে?

বিষয়টি নিয়ে ইসলামী গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমত না থাকলেও একটি বিষয়ে বেশিরভাগের অবস্থান স্পষ্ট। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও ইসলামী গবেষক মো. আনিসুজ্জামান সিকদারের মতে, ইসলামে নির্দিষ্ট কোনো পতাকাকে ‘ইসলামের পতাকা’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি।

তার ভাষ্য, মহানবী (সা.)-এর সময় যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন রঙের পতাকা ব্যবহারের ঐতিহাসিক বর্ণনা থাকলেও ইসলামের জন্য স্থায়ী বা নির্ধারিত কোনো পতাকার উল্লেখ ইসলামী সূত্রে পাওয়া যায় না।

কীভাবে শুরু হলো সাম্প্রতিক এই প্রবণতা?

গত জুন মাসে ঢাকার যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারে মধ্যরাতে কালেমাখচিত পতাকা টানানোর ঘটনা আলোচনায় আসে। পরদিন পতাকাগুলো সরিয়ে ফেলা হলে সেটিকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিভিন্ন স্থানে ‘ইসলামের পতাকার মর্যাদা রক্ষার’ দাবিতে মিছিল ও পতাকা টানানোর কর্মসূচি দেখা যায়।

এ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রামের এক কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক ও হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি হারুন ইজহারের একটি বক্তব্য। সেখানে তিনি ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিদেশি পতাকার পাশাপাশি কালেমার পতাকা টাঙানোর আহ্বান জানান।

ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের কর্মসূচি শুরু হয়।

হারুন ইজহারের ব্যাখ্যা

মুফতি হারুন ইজহার পরে গণমাধ্যমকে জানান, তার বক্তব্য ছিল মূলত বিদেশি পতাকার সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে কালেমাখচিত পতাকা ব্যবহারের প্রসঙ্গে।

তিনি বলেন, সারাদেশে যেভাবে মোটরসাইকেল র‍্যালি বা ব্যাপক কর্মসূচি হবে, তা তিনি কল্পনা করেননি। এসব আয়োজনের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততাও নেই বলে দাবি করেন তিনি।

একই সঙ্গে তিনি বলেন, কোথাও সন্দেহজনক কার্যক্রম থাকলে তা তদন্ত করা প্রশাসনের দায়িত্ব এবং প্রয়োজন হলে তারা সহযোগিতা করবেন।

কেন উঠছে উদ্বেগ?

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের একাংশের মতে, বর্তমানে ব্যবহৃত কিছু কালেমাখচিত পতাকার নকশা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কয়েকটি উগ্রবাদী সংগঠনের ব্যবহৃত পতাকার সঙ্গে মিল রয়েছে। এ কারণে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর আশঙ্কার কথাও তারা উল্লেখ করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, কালেমা মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত সম্মানিত একটি ধর্মীয় বিষয় হলেও নির্দিষ্ট নকশার পতাকাকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলে তা সামাজিক ও নিরাপত্তাগত উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর হুমকির অভিযোগ

এদিকে, ঢাকার একটি অনলাইন গণমাধ্যম কালেমাখচিত পতাকার নেপথ্য নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানটির সম্পাদক হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।

তার দাবি, প্রতিবেদনের পর টেলিফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত হুমকি ও আপত্তিকর মন্তব্য এসেছে। বিষয়টি নিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে।

প্রশাসনের অবস্থান

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো পতাকা বা প্রতীক যদি নিষিদ্ধ বা উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ বহন করে কিংবা জননিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে, তাহলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকেও ধর্মীয় প্রতীককে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি বা রাজনৈতিক অপব্যবহার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধর্মীয় প্রতীকের যথাযথ মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি।