বিএনপির আগামীর ‘ট্রাম্প কার্ড’ কী জুবাইদা!
- ভোটের মাঠে জুবাইদাকে নিয়ে নানা কৌতূহল
- তারেকের পাশে সার্বক্ষণিক সঙ্গী স্ত্রী জুবাইদা
রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা বাজছে। রাজপথ থেকে জনসভা সবখানেই এখন বিএনপির প্রচারণার মূল আকর্ষণ দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে এবারের নির্বাচনী মাঠে-ময়দানে ভোটারদের নজর কেড়েছে তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান। রাজনীতিতে তার আনুষ্ঠানিক পদচারণা নিয়ে যখন চারদিকে গুঞ্জন, তখন তার এই সরব উপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। তবে কেউ কেউ বলছেন, বিএনপির আগামী ট্রামকার্ড হচ্ছে জুবাইদা।
পেশায় চিকিৎসক জুবাইদা রহমান আগে কখনো সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না। তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি একাধিকবার দেশে এসে অসুস্থ শাশুড়ি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা দেখভাল করেছেন। সে সময় থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়—বিএনপির কোনো দায়িত্ব কি ধীরে ধীরে জুবাইদা রহমানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে? তখন বিষয়টি স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ না পেলেও, সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণা, জনসভা ও বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে তারেক রহমানের পাশে জুবাইদা রহমানের নিয়মিত উপস্থিতিকে অনেকেই আর কাকতালীয় বলে মনে করছেন না। কয়েকটি সমাবেশে তারেক রহমান নিজেই বলেছেন, এই যে আমি এত রাতে মিটিং করছি, রাজনীতি করছি—আমার স্ত্রী সহযোগিতা না করলে আমি পারতাম না। উনি আছেন বলেই আমি পেরেছি। তারেক রহমানের এই বক্তব্য এবং জুবাইদা রহমানের দৃশ্যমান উপস্থিতি আলোচনাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: কড়াইল, সাততলা ও টিএনটি বস্তিতে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের সমস্যা শোনালেন ডা. জুবাইদা রহমান
প্রবীণ রাজনীতিকরা এই দৃশ্যপটের সঙ্গে ৮০ দশকের মিল খুঁজে পাচ্ছেন। সেই সময় রাজপথে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে দেখা যেত তরুণ তারেক রহমানকে। কখনো মিছিলে, কখনো মায়ের বক্তৃতার ডায়াসের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি আগামীর নেতৃত্বের জানান দিয়েছিলেন। কয়েক দশক পর সেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে জিয়া পরিবারে; তবে এবার ভূমিকার পরিবর্তন ঘটেছে। স্বামীর রাজনৈতিক লড়াইয়ে শক্তি জোগাতে পাশে দাঁড়িয়েছেন স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান।
তারেক রহমান এবার ঢাকা-১৭ এবং বগুড়া-৬ (সদর) আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রাজনৈতিক মহলে জোরালো আলোচনা চলছে-যদি তিনি দুটি আসনেই জয়ী হন, তবে ছেড়ে দেওয়া আসনে কে স্থলাভিষিক্ত হবেন? পেশায় চিকিৎসক জোবাইদার ইমেজ আগে থেকেই অত্যন্ত ইতিবাচক। শিক্ষিত ও মার্জিত হিসেবে তরুণ ও নারী ভোটারদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক। তারেক-জোবাইদা কন্যা জাইমাকেও ইদানীং দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সামনে আনা হচ্ছে। লন্ডনে আইন পেশায় নিযুক্ত থাকলেও দেশের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছেন এই তরুণী।
আরও পড়ুন: আইডি হ্যাক হয়নি, নিজেদের রক্ষায় তারা মিথ্যা বলছে: তারেক রহমান
বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের সঙ্গে জোবাইদা রহমানের উপস্থিতি বিএনপির জনসভাগুলোতে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। একে অনেকে বিশ্ব রাজনীতির আধুনিক ধারার সঙ্গে তুলনা করছেন। পশ্চিমা দেশগুলোতে শীর্ষ নেতারা যেভাবে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে প্রচারণা চালান, তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও তেমনটি দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে তার রাজনৈতিক চিন্তাধারায় যে আধুনিকতার ছাপ পড়েছে, এটি তারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে। পেশাজীবী হিসেবে ডা. জোবাইদার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি দলের জন্য একটি বড় সম্পদ। নেতিবাচক রাজনীতির বাইরে থেকে তাকে ‘ভদ্র ও শিক্ষিত’ সমাজ যেভাবে গ্রহণ করেছে, তা নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে বিএনপিকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
তবে মূল প্রশ্নটি এখনো অধরা-জুবাইদা রহমান কি সরাসরি সংসদ সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে নামবেন, নাকি পর্দার আড়ালে থেকে স্বামীকে সমর্থন দিয়ে যাবেন? আর তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে জাইমা রহমান কি এখনই দলের হাল ধরবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো নির্বাচনের ফলাফল পরবর্তী সময়েই পরিষ্কার হবে। আপাতত, তারেক-জোবাইদার এই যুগলবন্দী বিএনপি সমর্থকদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করছে।
আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেবাশ্বের হোসেন টুটুল বলেন, তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রচারণায় জুবাইদা রহমানের উপস্থিতি মূলত রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের একটি সাংস্কৃতিক বার্তা বহন করে। জিয়া পরিবারে বেড়ে ওঠার সুবাদে পরিবারের নারী সদস্যকে গুরুত্ব দেওয়ার যে সংস্কৃতি, তার প্রতিফলন তারেক রহমানের আচরণে দেখা যায়। পশ্চিমা বিশ্বে দীর্ঘদিন অবস্থানকালে তিনি নারীর ভূমিকা ও অংশগ্রহণকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। নারীর হাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার যে পরিকল্পনার কথা তারেক রহমান বলেছেন, সেটিও নারীর ক্ষমতায়নের আরেকটি ধাপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি বলেন, আধুনিক সময়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাউকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে তার পারিবারিক স্থিতি ও মানসিক প্রশান্তিও বিবেচনায় নেওয়া হয়। একজন নেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার পারিবারিক পরিবেশ কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে জনগণের সামনে শুধু নেতা নয়, তার পরিবারকে উপস্থাপন করার মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার একটি পথ তৈরি হয়।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, তারেক রহমান মূলত এই বার্তাই দিতে চান-শুধু ব্যক্তি তারেক রহমান বা তার দলই জনগণের সেবা করবে না, বরং পরিবারগুলোও পুরুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করবে, নারী-পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালিদ আহমেদ বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পাশাপাশি তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও নির্বাচনী প্রচারণা ও রাজনৈতিক আলোচনায় যুক্ত হচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা আসে—তিনি কার্যত রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি কোনো দলীয় পদে নেই, তবে রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ মানেই রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা। যেহেতু তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন, ভবিষ্যতে তার নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি বর্তমানে সাংগঠনিক পুনর্গঠন, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং জনসমর্থন পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি গ্রহণযোগ্য নারী মুখ সামনে আনা কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক বশির ইবনে মুসা মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে মঞ্চের দৃশ্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কাউকে পাশে রাখা অনেক সময় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। জুবাইদা রহমানের উপস্থিতিকে তাই নিছক পারিবারিক উপস্থিতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিএনপির ভেতরে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কিছু বলা না হলেও, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে মঞ্চের দৃশ্যই অনেক সময় বড় বার্তা বহন করে।
এদিকে সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর এক শীর্ষ নেতা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তাদের দলীয় কাঠামোয় আমির পদে নারীর কোনো সুযোগ নেই। এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে। ঠিক একই সময়ে বিএনপির মঞ্চে জুবাইদা রহমানের উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার কন্যা জাইমা রহমানের দৃশ্যমানতা একটি বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত যেখানে নারী নেতৃত্বের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করছে, সেখানে বিএনপি নারী নেতৃত্বকে সামনে আনতে আগ্রহী—এমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে। এছাড়া আলোচনায় রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদের একটি প্রস্তাবিত ধারা। এতে বলা হয়েছে, কেউ প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হলে একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান বা সাধারণ সম্পাদক থাকতে পারবেন না। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে বিএনপি সরকার গঠন করলে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে তাকে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব ছাড়তে হবে। এই বাস্তবতায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। সেই আলোচনায় ডা. জুবাইদা রহমানের নাম উঠে এলেও দলীয়ভাবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত বা স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। বিএনপির নেতারা বলছেন, আপাতত দলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য। সাধারণ মানুষের আলোচনাতেও বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার মেরাজনগর আদর্শ বিদ্যালয়ের শিক্ষক জাকির খান বলেন, জুবাইদা রহমান একজন চিকিৎসক এবং পারিবারিকভাবে মেধাবী। তার উপস্থিতি বিএনপির রাজনীতিতে মানবিক ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করছে। ভবিষ্যতে তিনি দলীয় প্রধানের দায়িত্ব নিলে দল উপকৃত হতে পারে এবং দলকে আরও গতিশীল করতে পারবেন।
গণমাধ্যমকর্মী জেসমিন জুইয়ের মতে, নারীর নেতৃত্বকে আরও এগিয়ে নেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় ডা. জুবাইদা রহমানও নারীদের এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিচ্ছেন। তিনি বোঝাতে চান, নারী হিসেবে আমরা পুরুষের পাশে থেকে দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখতে পারি। তিনি বলেন, এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট, ডা. জুবাইদা রহমান বিএনপির কোনো দলীয় পদে নেই। কিন্তু সমাজ পরিবর্তন বা সেবার জন্য দলীয় পদ অপরিহার্য নয়। যেমন বেগম রোকেয়া কোনো রাজনৈতিক পদে ছিলেন না, তবুও তিনি নারীদের শিক্ষা আন্দোলনের পথিকৃৎ ছিলেন। মূল প্রশ্ন হলো, কে সমাজের জন্য কাজ করতে চান।





