যতই ঘনিয়ে আসছে নির্বাচন, বাড়ছে সহিংসতা ও প্রাণহানি
- দেশজুড়ে জমে উঠেছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা
- নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতাও বাড়ছে: আসক
- নারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে মহিলা জামায়াতের বিক্ষোভ
- কুষ্টিয়ায় সংঘর্ষে আহত ৭, নওগাঁয় আহত ১০, ভোলায় আহত ৯ ও রায়পুরায় গুলিতে কিশোর নিহত
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই হিসেবে নির্বাচনের বাকী আর মাত্র ৭দিন। এরইমধ্যে দেশজুড়ে পুরোদমে জমে উঠেছে ত্রয়োদশ নির্বাচন। তবে নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে,ততই বাড়ছে রাজনৈতিক হামলা,সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা। এসব হামলা ও খুনোখুনির ঘটনায় নাগরিক সমাজ ও ভোটারদের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক ছড়িায়ে পড়ছে। তারপর প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের ভোটারদের বাড়ি বাড়িতে প্রচার-প্রচারনায় পুরোদমে জমে উঠেছে ত্রয়োদশ নির্বাচন।
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটকেন্দ্র নিরাপদ রাখতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানানো হচ্ছে। কেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশ, বিজিবি ও আনসারের পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। বিভিন্ন সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তায় থাকবে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থাও যুক্ত করা হচ্ছে পুরো নিরাপত্তা পরিকল্পনায়। তবে মাঠপর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে কোনো কেন্দ্রে হঠাৎ সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা শুরু হলে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আদৌ তা দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে কিনা। একইসঙ্গে আলোচনায় রয়েছে, টানা দায়িত্ব ও চাপে থাকা পুলিশ সদস্যদের মানসিক প্রস্তুতি ও কাউন্সেলিং সহায়তা কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে। তাছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি সভা-সমাবেশে দেওয়া নেতাদের বক্তব্য থেকে পেশিশক্তি প্রদর্শনের ইঙ্গিত মিলছে। ফলে ভোটের দিন সংঘর্ষ বা উত্তেজনার আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন: শেরপুর-৩ আসনের ভোট স্থগিত , ১২ ফেব্রুয়ারির পর পুনঃতফসিল ঘোষণা: ইসি মাছউদ
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ত্রয়োদশ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলোকে আরো দায়িত্বশীল ও তৎপর হতে হবে। একইসঙ্গে ভোটের মাঠে আতঙ্ক দূর করতে হবে। অন্যথায় ভোটাররা উৎসাহ হারাবেন। সর্বশেষ গতকাল বুধবার সকালে কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) উপজেলার মাশালিয়া বাজারে ভোট চাওয়াকে কেন্দ্র করে জামায়াত ও বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ৭ জন কর্মী-সমর্থক আহত হন। এর মধ্যে বিএনপির ৩ কর্মীকে খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। বিএনপির দাবি, জামায়াত শিবিরের অতর্কিত হামলায় তাদের ৪ জন কর্মী-সমর্থক আহত হয়। এর মধ্যে ৩ জনকে খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। জামায়াতের দাবি, বিএনপির হামলায় তাদের ৩ জন কর্মী-সমর্থক আহত হয়েছেন। জয়ন্তীহাজরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সাবেক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, মঙ্গলবার বিকালে এক ভোটরের বাড়িতে ৯নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও স্থানীয় জামায়াত নেতা আবু দাউদসহ জামায়াত শিবিরের ৩জন কর্মী ভোট চাইতে যান। এসময় সেই ভোটার সরাসরি ধানের শীষে ভোট দেবে বলে জানিয়ে দেন। এসময় সেই ভোটারের সাথে তাদের বাকবিতণ্ডা হয়। আমি রাতে বাজারে গেলে আমাদের কর্মী-সমর্থকরা আমাকে জানায়। আমি সকালে মিটিংয়ের কথা বললে উভয়পক্ষের লোকজন সেই মিটিংয়ে আসে। তিনি বলেন, উভয়পক্ষের কথা শুনে মিল করে দেওয়া হয় কিন্তু হঠাৎ করেই জামায়াতের কর্মীরা আমাদের উপর লাঠি, হাত কুড়াল, হাতুড়ি নিয়ে অতর্কিত হামলা করেন। এসময় আমাদের কর্মী রিন্টু, তুহিন ও নিজাম উদ্দিন আহত হয়ে খোকসা উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি হয়। আমরা আমাদের নেতাদের জানিয়েছি। তারা আইনগত ব্যবস্থা নেবেন। ইউনিয়ন জামায়াতের আমির আকমল হোসেন জানান, আমাদের লোকজন মঙ্গলবার ভোট চাইতে গেলে এক ভোটারের সাথে একটু ঝামেলা হয়। বুধবার সকালে এর সমাধানের জন্য মিটিংয়ে বসা হলে সব ঠিকঠাক হয়ে যায়। তবে অতর্কিত হামলার বিষয় সঠিক না। মিটিংয়ের শেষে সেই ভোটারের সাথে হাত মেলানোর সময় বিএনপির এক কর্মী এসে আমাদের লোকজনের উপর হামলা করে। সেই সময় এই সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এই হামলার জন্য বিএনপির লোকজন দায়ী। তিনি আরও বলেন, বিএনপির হামলায় আমাদের ৩জন কর্মী আহত আছেন। আমরা কোন অস্ত্র ব্যবহার করিনি। এটা তারা মিথ্যা কথা বলছেন। আমরা আমাদের উপজেলা আমিরকে বিষয়টি জানিয়েছি। তারা ব্যবস্থা নেবেন। একইদিন নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে এক কিশোর নিহত হয়েছে। বুধবার সকালে উপজেলার শ্রীনগর ইউনিয়নের সায়দাবাদ গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত কিশোর মোস্তাকিম মিয়া (১৪) ওই গ্রামের মাসুদ মিয়ার ছেলে। নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুজিবুর রহমান। নিহতের মা শাহানাজ বেগম জানান, বুধবার সকাল ৬টার দিকে তিনি ঘুম থেকে উঠে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় বাড়ির পাশের সড়কে এসে দুর্বৃত্তরা ঘরের পাশ থেকে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। এতে তার ছেলে মোস্তাকিম গুলিবিদ্ধ হয়। তিনি জানান, তার স্বামী মাসুদ মিয়া প্রবাসে থাকেন। তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলে বিদেশে কর্মরত এবং ছোট ছেলে সেনাবাহিনীতে চাকরি করেন। তাদের পরিবার কোনো দল বা গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তিনি মোস্তাকিমকে নিয়ে বাড়িতে বসবাস করতেন। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি। গত মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভোলার দৌলতখান উপজেলার মেদুয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মুন্সিরহাট এলাকায় নির্বাচনী প্রচার নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ৯ জন আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বোরহানউদ্দিনে থানা মোড় এলাকায় নির্বাচনী প্রচারে নারী কর্মীদের হেনস্তার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে জামায়াতের মহিলা শাখা। গত মঙ্গলবার বিকেলে সাড়ে ৩টার দিকে নওগাঁ সদর উপজেলার মাখনা কোমলগোটা গ্রামে জামায়াত-বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের সংঘর্ষে অন্তত ১০জন আহত হয়েছে। এ ঘটনার পর থানা পুলিশ ও সেনাবাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। তবে সদর উপজেলার হাঁসাইগাড়ী ইউনিয়নে প্রত্যন্ত গ্রাম মাখনা কোমল গোটায় জামায়াতের এক কর্মীর বাড়িতে দুপুরের খাবারের আয়োজন করা হয়েছিলো। ওই এলাকায় নির্বাচনি প্রচারণা শেষে নওগাঁ-৫ (সদর) আসনের জামায়াত প্রার্থী অ্যাড. আ.স.ম সায়েমসহ কর্মী সমর্থকরা অপেক্ষা করছিলো। এসময় গোপাই গ্রামের বিএনপির কর্মী সমর্থকরা তাদের খাবারের ভিডিও ধারণ করছিল। ছবি ওঠানো নিয়ে দুইপক্ষের মধ্যে বিতর্ক হয়। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে দুইপক্ষের অন্তত ১০ জন নেতাকর্মী আহত হয়। পরে হাঁসাইগাড়ী ইউনিয়নের বিএনপি নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে জামায়াত নেতাকর্মীদের ঘরবন্দি করে রাখে। পরে থানা পুলিশ ও সেনাবাহিনী গিয়ে তাদের উদ্ধার করেন। এরআগে গত শুক্রবার বিকেলে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হন অন্তত ১০ জন। গত ২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারের মিরেরবাগ এলাকার দুই প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে তিনজনের আহত হয়েছে। পরে আহততের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী সাইফুল হক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম নীরবের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। হাতিরঝিল থানার ওসি গোলাম মর্তুজা বলছেন, একদল মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় আরেকদলকে ‘সাইড’ দেওয়া নিয়ে হাতাহাতি থেকে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে কোদাল প্রতীকের সাইফুল হকের তিনজন আহত হন। আহতদের পক্ষ থেকে অভিযোগ নিয়ে থানায় এসেছে। পরবর্তীতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আহতরা হলেন-আহাদ হোসেন খান (২৭), মো. হোসেন (৩৫) ও আব্দুর রহমান সাকিন (৩০)। রাতে আহতদের দেখতে ঢাকা মেডিকেলে যান বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান সাইফুল হক। এভাবে গত ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে হতাহত বেড়েই চলেছে।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে,বাড়ছে রাজনৈতিক সহিংসতা: জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। গত মঙ্গলবার আসক থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলা হয়েছে। গত ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহতের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাজনৈতিক সহিংসতার ১৮টি ঘটনা ঘটে, যাতে ২৬৮ জন আহত এবং ৪ জন নিহত হন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। ওই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫টিতে, এতে ৬১৬ জন আহত এবং ১১ জন নিহত হন বলে সংস্থাটি তাদের সর্বশেষ বিশ্লেষণে জানিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ও ২২ জানুয়ারি থেকে প্রচার শুরু হওয়ার পর সংঘর্ষের মাত্রা বেড়ে যায়। শুধু ২১ থেকে ৩১ জানুয়ারির মধ্যেই ৪৯টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যাতে ৪১৪ জন আহত এবং ৪ জন নিহত হন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, সহিংসতার প্রবণতা ততই ঊর্ধ্বমুখী। এছাড়া সাংবাদিকরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় ১১ জন সাংবাদিক বাধা বা হামলার মুখে পড়েন, যা জানুয়ারিতে বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ জনে। দেশের এই ক্রমবর্ধমান সহিংস পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আসক। সংস্থাটি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সহনশীলতা ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে আসক এর পক্ষ থেকে।
আরও পড়ুন: নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নেই—ইসির আশ্বাসে আস্থা হারাচ্ছে এনসিপি
এ বিষয়ে ঢাবির সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি নিয়ে সহিংসতা বাড়ছে। তবে প্রার্থীদের মধ্যে মূল্যবোধের অভাব ও প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রতিযোগী হিসেবে না দেখার কারণই নির্বাচনি সহিংসতা বাড়ছে। এসব ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে সমানভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে—নতুবা পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ সার্বক্ষণিক সতর্ক রয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে জনমনে আস্থা ও স্বস্তি আনতে কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। নির্বাচনে নাশকতা সৃষ্টি করতে পারে এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগুলোর ওপর নজরদারি জোরদার ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে অনেক অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, যার মধ্যে থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্রও রয়েছে। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বডিওর্ন ক্যামেরাসহ পুলিশ নিয়োজিত থাকবে, যাতে কোনও ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। পুলিশ সদর দফতর থেকে নির্বাচনি সব কার্যক্রম মনিটরিং করা হবে। একইসঙ্গে পুলিশের সব ইউনিটকে দাফতরিক কাজ কমিয়ে মাঠে সময় দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে,ততই প্রচার-প্রচারণা জমে উঠেছে। এতে নির্বাচনী মাঠ ও নির্বাচনী পরিবেশ উৎসবমুখর হয়ে উঠছে। অবিরাম প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ততম সময় পাড় করছেন প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকরা। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল বুধবার রাজধানীর ইসিবি চত্বরে ঢাকা ১৭ আসনের তারেক রহমানের পক্ষে গণসংযোগ করেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ঢাকা-১৭ আসনের বিএনপির নির্বাচনি পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক আবদুস সালাম। তিনি বলেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, জামায়াতের আচরণ তত অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। তিনি আরও বলেন, জামায়াতের বর্তমান আচরণই প্রমাণ করে, তাদের সামনে আর বেশি সময় নেই। এই কয়েক দিনের মধ্যে তাদের অবস্থা আরও খারাপ হবে বলেই এখন থেকেই তারা অস্থির হয়ে পড়েছে। জামায়াতের নেতাদের উদ্দেশে আবদুস সালাম বলেন, এখন ধৈর্য ধরার সময়। ১২ তারিখ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে থাকতে হবে। নইলে ১২ তারিখের পর শুয়ে পড়তে হতে পারে। যদি বেশি অধৈর্য হন তাহলে বইসা যান। মঙ্গলবারের একটি ঘটনাকে ন্যাক্কারজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এর মাধ্যমে জামায়াতের প্রকৃত চেহারা উন্মোচিত হয়েছে। জামায়াত এখনো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে গ্রহণ করতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল বলেই এখনো তারা পাকিস্তানি ভাবধারায় রয়েছে। সেনাবাহিনী সম্পর্কে অবমাননাকর বক্তব্য ও সমালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ওই বক্তব্যে অকারণে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম টেনে আনা হয়েছে। জামায়াতের প্রার্থীর চেয়ে তারেক রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত হতে তারা বেশি আগ্রহী বলেই মনে হয়। তিনি বলেন, কিছু সাংবাদিক ও মহল জামায়াতকে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। জামায়াত এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তিনি বলেন, ইনশা আল্লাহ তারেক রহমান আগামী দিনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন। বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে এবং দেশকে রক্ষা করতে হলে তারেক রহমানের কোনো বিকল্প নেই। জামায়াতকে ‘পরীক্ষিত বেঈমান’ আখ্যা দিয়ে আবদুস সালাম বলেন, পাকিস্তান হওয়ার সময় তারা পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছে, আবার বাংলাদেশ হওয়ার সময় বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে। শুধু বিরুদ্ধেই নয় বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে। নির্বাচনের দিন ভোট দেওয়ার পাশাপাশি ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোথাও কারচুপি হতে দেওয়া যাবে না। বিএনপি কোনো গোপন দল নয়, এটি একটি প্রকাশ্য ও গণতান্ত্রিক দল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ সময়ের উপস্থিত ছিলেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, তাবিদ আউয়ালসহ স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায় নেতাকর্মী ও এলাকাবাসী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচ ঢাকা-৫ আসনে বিএনপি মনোনিত আলহাজ্ব নবী উল্লাহ নবী রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ ও ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন বিএনপির মনেনীত প্রার্থী নবী উল্লাহ নবী। বুধবার দিনব্যাপী ডিএসসিসির ৬২ নম্বর ওয়ার্ডের প্রতিটি এলাকায় এসব কর্মসূচী পালন করেন এদিন দূপুর থেকে ওয়ার্ডের বিভিন্ন সড়ক, বাজার ও আবাসিক এলাকায় দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন নবী উল্লাহ নবী। এ সময় তিনি এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যা, নাগরিক দুর্ভোগ ও প্রত্যাশার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। এ সময় তিনি বলেন, আমি কোনো বির্তকিত ভাবে নয় জনগনের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত জনতার এমপি হিসাবে আপনাদের পাশে থাকতে চাই। নির্বাচিত হলে এলাকায় দুবৃত্তায়নও চাঁদাবাজি দূর করে মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করবো। আর জনগণের ভোট ও ভালোবাসা পেলে ঢাকা-৫ কে একটি বাসযোগ্য, নিরাপদ ও আধুনিক আসন হিসেবে গড়ে তুলবো। বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থান, নারীদের ক্ষমতায়ন এবং মৌলিক নাগরিক অধিকার বাস্তবায়নে কাজ করাই হবে আমার প্রধান লক্ষ্য। এক্ষেত্রে ঢাকা-৫ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিকল্পিত নগরায়ণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা হবে। এ ছাড়া নারীদের সথাযথ মর্জনাদা প্রতিষ্ঠা করবো এবং তারেক রহমানের ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীদের স্বাবলম্বী করা হবে অগ্রাধিকার বিত্তিতে। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চাইছেন ঢাকা-১১ আসনে ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম। বুধবার সকাল থেকে রাজধানীর রামপুরায় মৌলভীরটেক, বউ বাজার, চৌধুরী পাড়া ও পশ্চিম হাজিপাড়া এলাকায় গণসংযোগ করেছেন তিনি। অনান্য দিনের মতো বুধবার সকাল থেকেই তিনি ভোটারদের কাছে ভোট চাচ্ছেন। এ সময় স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি-দাওয়ার কথাও শোনেন। এদিন দুপুরে রামপুরায় মাটির মসজিদ এলাকায় মহিলা ভোটার সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনে নারীরা অপরিসীম ভূমিকা পালন করেন, তারা রাস্তায় নেমে এসে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এদিন বিকেলে তালতলা মার্কেটে ব্যবসায়ী সমাবেশে যোগদান, মাটির মসজিদ চৌরাস্তায় উঠান বৈঠক এবং রাতে মালিবাগ জামেয়া মসজিদের পূর্ব গেটের সামনে উঠান বৈঠক করবেন নাহিদ ইসলাম। গণসংযোগ ও সমাবেশে স্থানীয় নেতাকর্মী এবং সমর্থকরা উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন বাংলাদেশ মুসলিম লীগের প্রার্থী: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৩ আসনের হারিকেন প্রতীক প্রার্থী শাহরিয়ার ইফতেখার নামে এক প্রার্থী সরে দাঁড়িয়েছে। বুধবাররাজধানীর মোহাম্মদপুরে সূচনা কমিউনিটি সেন্টারে ঢাকা-১৩ সংসদীয় আসনের সকল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ ও আচরণবিধি প্রতিপালন ঘোষণা অনুষ্ঠানে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা জানান। শাহরিয়ার কবির বাংলাদেশ মুসলিম লীগ থেকে হারিকেন প্রতীকে ঢাকা ১৩ আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন। আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র প্রয়োজনের কথা বলে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের আহ্বান জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। এই আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপি থেকে নির্বাচন করছেন ববি হাজ্জাজ। অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে রিকশা প্রতীকে লড়বেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। এছাড়াও, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ এর পক্ষ থেকে আপেল মার্কা নিয়ে ফাতেমা আক্তার মুনিয়া, গণঅধিকার পরিষদ থেকে ট্রাক মার্কা মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) থেকে মই মার্কা মো. খালেকুজ্জামান, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) থেকে রকেট মার্কা মো. শাহাবুদ্দিন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে শেখ মো.রবিউল ইসলাম ঘুড়ি মার্কা ও সোহেল রানা কলস মার্কা নিয়ে নির্বাচন করছেন।





