ক্ষমতায় গেলে তরুণ-তরুণীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেবে জামায়াত

Sanchoy Biswas
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত: ৮:৩৯ অপরাহ্ন, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১০:১৫ অপরাহ্ন, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়নের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি যুবকের কর্মসংস্থান ও নতুন মন্ত্রণালয় গঠনের লক্ষ্য নির্বাচনী ইসতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তারমধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনায় যুবকদের প্রাধান্য, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত, প্রযুক্তি নির্ভর সমাজ গঠন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপসহ ২৬টি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে ৪১ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এছাড়াও রয়েছে ৫টি ‘হ্যাঁ’ ও ৬টি ‘না’। 

গতকাল বুধবার রাজধানীর হোটেল সেরাটনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। দলটির এই ইশতেহারে বলা হয় বাংলাদেশকে বিশ্বের ২০তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছে দলটি।

আরও পড়ুন: জামায়াতে ইসলামীর নেতারা আমেরিকায় আমাদের জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করেছে

বর্তমানে ৩৫তম অবস্থানে থাকা এই অর্থনীতিকে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে দলটি। যেখানে মাথাপিছু আয় হবে ১০ হাজার মার্কিন ডলার এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার পর্যায়ক্রমে ৭ শতাংশে উন্নীত করা হবে। 

ইশতেহারে বলা হয়, সরকার গঠন করলে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বর্তমানের ৩৫তম অবস্থান থেকে ২০তম অবস্থানে উন্নীত করা হবে। বর্তমানে ধুঁকতে থাকা ব্যাংকিং খাতের ক্ষত সারাতে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘আর্থিক খাত সংস্কার কমিশন’ গঠনের কথা বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন: এত সীমিত সময়ের প্রচারণা আমার রাজনৈতিক জীবনে প্রথম অভিজ্ঞতা: মির্জা আব্বাস

দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, খেলাপি ঋণ সহনীয় পর্যায়ে আনা এবং বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত আনা হবে তাদের অগ্রাধিকার। এছাড়া শেয়ার বাজারে কারসাজি বন্ধ করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে দলটি।

জামায়াতের ইশতেহারে সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয়: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে রাজধানীতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ইশতেহার ঘোষণা করে জামায়াত। সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে জামায়াত তাদের ইশতেহারে বলেছে, ইডেন কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ এবং হোম ইকোনমিক্স কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করা হবে।

ইশতেহারের প্রথমভাগে রয়েছে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষায় একটি বৈষম্যহীন, শক্তিশালী ও মানবিক বাংলাদেশ, দ্বিতীয় ভাগে আত্মনির্ভরতার পথ নিজ পায়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয়, তৃতীয়ত ভাগে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ব্যাপকভিত্তিতে কর্মসংস্থান, চতুর্থ ভাগে স্বনির্ভর কৃষি ও প্রকৃতির স্বাভাবিক বিকাশের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, পঞ্চম ভাগে মানবসম্পদ ও জনজীবনের মৌলিক মানোন্নয়ন, ষষ্ঠ ভাগে সমন্বিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সপ্তম ভাগে যুবকদের নেতৃত  প্রযুক্তি বিপ্লব ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ও অষ্টম ভাগ সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র।

ত্রয়োদশ নির্বাচনি ইশতেহারে যে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিবে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-১. ‘আতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ এই জোবানের আলোকে স্বাধীনছে, সার্ককৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন (জাতীয় স্বার্থ)। ২. বৈষমাহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন (সামাজিক ন্যায়বিচার)! ৩. যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরাক প্রাধান্য দেওয়া (তরুণ বা যুবসমাজকে প্রধান্য দেওয়া)। ৪. নারীদের জন্য নিরাপদ, মঘাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন (নারীর অংশগ্রহণ)। ৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ (জননিরাপত্তা ও নিরাপত্তা বা জনসাধারণের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা)! ৬. সকল পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন (শূন্য দুর্নীতি)! ৭. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন (প্রযুক্তি-ভিত্তিক সমাজ)। ৮. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পদহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনামূালা অ্যাবদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সকল ধরানর বৈষম্য দূরীকরণ (ব্যাপক বেকারত্ব বা বিস্তৃত বেকারত্ব)!

৯. ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক যাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও বাবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ (সুদৃঢ় ও টেকসই অর্থনীতি)! ১০. সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকাররাবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্ঘকর গণতন্ত্র নিশ্চিত। করা (শক্তিশালী ও কার্যকর গণতন্ত্র)! ১১. বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া খুন, ওম ও বিচারবহিভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা (ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার)। ১২. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গু পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে (জুলাই স্পিরিট)। ১৩. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা (কৃষি বিপ্লব)। ১৪. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বার্জার শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা, বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়া (খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব। ১৫. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ণ ও কর্মসংস্থান তৈরি (শিল্পায়ন)। ১৬. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ, বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ, সৃষ্টি করা (যৌক্তিক বেতন এবং ঝামেলা-মুক্ত কাজের পরিবেশ)! ১৭. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সকল অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা (প্রবাসী ব্যক্তি)! ১৮. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়; বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিমোব সকলের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা (অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র)। ১৯. আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান (সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা) এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। ২০. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রাম বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা (শিক্ষা সংস্কার)। ২১. দ্রব্যমূলা ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা (অপরিহার্য বা মৌলিক প্রয়োজনসমূহ সরবরাহ/সরবরাহকরণ)! ২২. যাতায়াতব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সাথে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা (পরিবহন বিপ্লব)। ২৩. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূলো আবাসন নিশ্চিত করা (সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন)! ২৪. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী বাবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা (ফ্যাসিবাদ-সমর্থক ব্যবস্থার সংস্কার)। ২৫. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাবাবস্থা চালু করার মাধ্যাম নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত। করা (সামাজিক নিরাপত্তা)!

২৬. সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুধী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা (কল্যাণ রাষ্ট্র)।

এরআগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে তরুণ-তরুণীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেবে জামায়াত। ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির ডা শফিকুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পারওয়ারসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ উপস্থিত আছেন। ইশতেহারে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে জাতির ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্র, সুশাসন ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর দৃষ্টিভঙ্গি ও অঙ্গীকার জাতির সামনে তুলে ধরা হয়েছে।

ক্ষমতায় গেলে দেশের ১৮-২২ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের ছয় থেকে ১২ মাস মেয়াদি সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চালু করবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীর প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি জাতীয় সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারের কার্যকর প্রতিরক্ষা স্বাধীনতার পূর্বশর্ত অংশে এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত।