কর্মবিরতির পর লাগাতার ধর্মঘটের ডাক, চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে কী হচ্ছে?
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি আরব আমিরাত ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপিওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রোববার থেকে লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এই কর্মসূচিতে এবার বন্দরের বহির্নোঙরেও কাজ বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন থেকে এই কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: ‘আসমানে ফয়সালা হয়ে গেছে তারেক রহমানই আগামীর প্রধানমন্ত্রী’
বন্দরের এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে গত শনিবার থেকে আট ঘণ্টা করে তিন দিন এবং মঙ্গলবার থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করে আসছিল সংগঠনটি।
শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতিতে ছয় দিন অচল অবস্থায় ছিল বন্দর। এতে বন্দরের জেটি, টার্মিনাল, শেড ও ইয়ার্ডে পণ্যবাহী কনটেইনার জমে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন; তাদের অনেকে পড়েছেন নানা রকম সংকটে।
আরও পড়ুন: কাপাসিয়ার সার্বিক উন্নয়নে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করেন শাহ রিয়াজুল হান্নান
এমন অবস্থায় রোববার থেকে লাগাতার ধর্মঘটের ঘোষণার পর শ্রমিক কর্মচারীদের সাথে সাথে বৈঠক ডেকেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুক বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "নৌ পরিবহন উপদেষ্টা তাদের (আন্দোলনকারীদের) অনুরোধ করেছেন। চেয়ারম্যানও রোববার তাদের সাথে বৈঠক করবেন। তাদের সাথে কথা বলার পর আশা করি এই নিয়ে সংকট থাকবে না"।
এর আগে গত শনিবার থেকে লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণা দেয় শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ। পরে গত বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। পরে দুইদিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন সংগ্রাম পরিষদের নেতারা।
এরপর হঠাৎ করে শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে নতুন এই কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়ায় বন্দর ঘিরে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, এর আগে বন্দরে বিভিন্ন সময় ধর্মঘট পালন হলেও সেটি এনসিটিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। বহিঃনোঙ্গরে ধর্মঘট কিংবা এত বড় পরিসরে কখনো আন্দোলন হয়নি।
এতে বন্দরেরে ক্ষতির চেয়ে জাতীয় অর্থনীতিতেই বেশি প্রভাব ফেলবে বলেও মনে করছেন তারা।
শ্রমিক দল থেকে সংগ্রাম পরিষদ
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি আরব আমিরাত ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপিওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শুরু থেকেই আন্দোলন করে আসছিল চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত শনিবার, অর্থাৎ গত ৩১শে জানুয়ারি থেকে কর্মবিরতির ডাক দেওয়া হয় আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে।
শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতিতে ছয় দিন অচল অবস্থায় ছিল বন্দর। বন্দরের জেটি, টার্মিনাল, শেড ও ইয়ার্ডে পণ্যবাহী কনটেইনার জট তৈরি হয়।
এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিক কর্মচারীদের সাথে গত বৃহস্পতিবার বৈঠকে বসেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। বৈঠকের পর শুক্র ও শনিবার দুইদিন কর্মসূচি স্থগিত করেন আন্দোলনরত শ্রমিক কর্মচারীরা।
ওইদিন তারা আল্টিমেটাম দিয়ে জানান, আরব আমিরাত ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপিওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে না আসে রোববার থেকে পুনরায় কর্মসূচি শুরু হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয় 'বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ' এই ব্যানারে।
সেখানে রোববার সকাল আটটা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দেয় তারা। এর আগে শুধু এনসিটিতে ধর্মঘট চললেও রোববারের ধর্মঘটে বহিনোঙরের কাজও বন্ধ থাকবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয় সংবাদ সম্মেলনে।
এই আন্দোলনের নেতৃত্বে আছেন চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খোকন। সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত কয়েক মাস ধরে তারা যে সব কর্মসূচি পালন করছিলো সেটি ছিল শ্রমিক দলের ব্যানারে।
গত সপ্তাহ থেকে তাদের এই কর্মসূচি শুরু হয় বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে। সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও বন্দর শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মি. খোকন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দল গত দেড় বছর বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে"।
"শ্রমিক দলের পাশাপাশি আরো বেশ কয়েকটা শ্রমিক সংগঠনও আছে। তারাও আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় এখন আমরা শ্রমিক দলের ব্যানারে না করে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলন করছি গত সপ্তাহ থেকে," বলেন তিনি।
আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা
সরকারের নৌ পরিবহন উপদেষ্টা, বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে দফায় দফায় আলোচনার পরও দাবি না মানায় গত সপ্তাহ থেকে কর্মবিরতিতে যায় আন্দোলনকারীরা।
শনিবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে চারদফা দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।
এই দাবিগুলো হচ্ছে- এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ না দেওয়ার বিষয়ে সরকার কর্তৃক ঘোষণা দেওয়া, বন্দর চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহার করে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা, আন্দোলনরত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া।
আন্দোলনকারী শ্রমিকরা বলছেন, তাদের এই দাবি না মানা হলে তারা রোববার থেকে ডাক এই কর্মসূচি থেকে সরে আসবেন না।
আন্দোলনের সমন্বয়ক ও শ্রমিক দল নেতা ইব্রাহীম খোকন বিবিসি বাংলা বলেন, "আমরা আমাদের অবস্থানেই অনড় আছি। আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যে লাগাতার কর্মসূচির ডাক দিয়েছি তা পালন করে যাবো"।
তিনি বলেন, এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারও ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বন্দর দিতে চেয়েছিল। তখন প্রত্যেক শ্রমিককে ২৩ লাখ টাকা করে দিয়ে বিদায় করার চেষ্টা করেছিল তৎকালীন সরকার। এতে অনেক কর্মচারি চাকরি হারাতো।
শ্রমিক নেতারা বলছেন, সরকার যদি এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে তারা তাদের ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আগের অবস্থানেই অনড় থাকবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুক বিবিসি বাংলাকে বলেন, "কাল আমাদের চেয়ারম্যান শ্রমিক সংগঠনগুলোর সাথে কথা বলবেন। আমরা আশা করছি তাদের সাথে আলোচনার এক পথ বের হয়ে আসবে। আমরা দেখছি"।
বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সমুদ্রপথে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের ৭৮ শতাংশ পরিবহন হয়। আর কনটেইনার পরিবহনের কার্যত একমাত্র বন্দর এই চট্টগ্রামই।
এই বন্দর দিয়ে কনটেইনারের ৯৯ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয়। বন্দর স্থগিত বন্ধ হলে কনটেইনারে রপ্তানি প্রায় পুরো বন্ধ হয়ে যায়। কনটেইনারে আমদানি করা শিল্পের কাঁচামাল খালাসও বন্ধ হয়ে পড়ে।
কর্মবিরতির কারণে মঙ্গলবার ও বুধবার কোনো কনটেইনার খালাস হয়নি বন্দরে। ৫৯ হাজার কনটেইনার ধারণক্ষমতার বন্দরে বর্তমানে ৩৭ হাজার ৩১২টি কনটেইনার জমা পড়েছে।বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনারের স্তূপ আরও বাড়ছে।
বন্দরের ভেতর জেনারেল কার্গো বার্থ, চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল- এই তিনটি মূল টার্মিনালেই কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে।
বন্দরের জেটি ও বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় বাড়ছে জাহাজের পরিমাণ। এমন অবস্থায় রোববার থেকে লাগাতার ধর্মঘটে সংকট আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে সাবেক মেম্বার (সদস্য) মো. জাফর আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এতে পণ্য আমদানি রফতানি বন্ধ থাকবে। এক ধরনের অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে। অনেক রফতানি অর্ডার বাতিল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতি যেটা হবে সবচেয়ে বাজে একটা সিগন্যাল বাইরে যাবে চট্টগ্রাম বন্দর সম্পর্কে"।
তিনি বলছিলেন, এনসিটি যদি একদিন বন্ধ থাকে তাহলে দিনে গড়ে তিন কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়। বন্দরের এই কার্যক্রম বন্ধ থাকলে বন্দর কর্তৃপক্ষের যা ক্ষতি তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে দেশের অর্থনীতির।
মি. আলম বলেন, "লাগাতার অবরোধের ফলে অপ্রত্যাশিতভাবে অনেকদিন বাণিজ্যিক জাহাজ বন্দরে আটকে থাকবে। ভাড়া বেড়ে যাবে যদি এটা দীর্ঘদিন ধরে হয়। অনেকে শিডিউল মিস করবে। এটা ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক বড় ক্ষতি"।





